রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট (Ratargul Swamp Forest), বাংলাদেশের একমাত্র স্বাদুপানির জলাবন এবং এটি সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নে, সিলেট শহর থেকে প্রায় ২৬-৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বাংলাদেশে নৌকায় চড়ে গাছের ভেতর দিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা একটাই জায়গায় পাওয়া যায় সেটা রাতারগুল। পুরো এলাকার আয়তন প্রায় ৩০,৩২৫ একর, যার মধ্যে প্রকৃত বনভূমি প্রায় ৫০৪ একর আর বাকি অংশ ছোট-বড় জলাশয়ে পূর্ণ। এটি বাংলাদেশের একমাত্র সোয়াম্প ফরেস্ট বা জলাবন, অর্থাৎ এমন বন যেখানে বছরের একটা বড় সময় গাছগুলো পানির নিচে ডুবে থাকে।
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় বাংলাদেশের একমাত্র স্বাদুপানির জলাবন এই রাতারগুল, যাকে অনেকে আদর করে “বাংলাদেশের আমাজন” বলেন। বর্ষায় গেলে পুরো বনটাই পানিতে ডুবে থাকে, আর ছোট নৌকায় চড়ে গাছের সারির মাঝখান দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অনুভূতিটা সত্যিই অন্যরকম। চারপাশে শুধু পানি আর গাছ, মাথার উপর সবুজ ছাউনি! এই দৃশ্য একবার দেখলে কেন মানুষ রাতারগুলের জন্য এত দূর থেকে আসে সেটা বুঝে যাবেন।
আরও: পান্থুমাই ঝর্ণা
কী কী দেখবেন
ডুবে থাকা গাছের সারি: বর্ষায় রাতারগুলের আসল রূপ ফুটে ওঠে। পানির স্তর এতটাই বেড়ে যায় যে গাছের অর্ধেকের বেশি ডুবে যায়, শুধু মাথার দিকটা জলের উপর জেগে থাকে। নৌকা সেই গাছের সারির ভেতর দিয়েই চলে, মাঝে মাঝে গাছের ডাল গায়ে লাগে, এই অনুভূতিটাই রাতারগুলের আসল আকর্ষণ।
ওয়াচ টাওয়ার: বনের ভেতরে একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার আছে। উপরে উঠলে পুরো জলাবনটাকে একসাথে দেখা যায়, সবুজ গাছের ছাউনি আর তার মাঝে ছড়িয়ে থাকা পানির আয়না। ছবি তোলার জন্য এই জায়গাটা বেশ ভালো।
নৌকায় ভেসে ভেসে যাওয়া: ছোট ডিঙি নৌকায় চড়ে মাঝি গাছের ফাঁক দিয়ে এগিয়ে যান। ইঞ্জিনচালিত বড় নৌকা ব্যবহার করা হয় না বনের গভীরে, কারণ এতে বনের ক্ষতি হতে পারে। এই শান্ত, ধীর গতির ভ্রমণটাই রাতারগুলকে অন্য সব জায়গা থেকে আলাদা করে।
জলাবনের জীববৈচিত্র্য: বনের ভেতরে নানা প্রজাতির পাখি, সাপ ও জলজ প্রাণী দেখা যায়। স্থানীয় মাঝিরা প্রায়ই কোথায় কী আছে দেখিয়ে দেন। চোখ-কান খোলা রাখলে অনেক কিছু নজরে পড়বে।
শুকনো মৌসুমের ভিন্ন রূপ: বর্ষা শেষে পানি কমে গেলে বনটা পুরোপুরি আলাদা চেহারা নেয়, গাছের গোড়া দেখা যায়, কাদামাটির ভেজা মেঝে স্পষ্ট হয়। বর্ষার রাতারগুল আর শীতের রাতারগুল আসলে দুটো আলাদা অভিজ্ঞতা।
ভ্রমণের সেরা সময়
রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট ভ্রমণের সেরা সময় হচ্ছে, জুন থেকে অক্টোবর মাস। বর্ষা ও বর্ষার পরের সময়টা রাতারগুল দেখার আসল মৌসুম। এই সময়ে পানি সবচেয়ে বেশি থাকে, নৌকা অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে, আর গাছগুলো অর্ধেক ডুবে থাকার যে দৃশ্য, সেটাই রাতারগুলের পরিচয়। শীতকালে পানি কমে যায়, তখন নৌকা শুধু মূল খাল দিয়েই চলতে পারে, বনের ভেতরে ঢোকার সুযোগ কম থাকে। তাই শীতে গেলে রাতারগুলের পূর্ণ সৌন্দর্য মিস করার সম্ভাবনা থাকে।
কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সিলেট ট্রেনে: কমলাপুর থেকে পারাবত, জয়ন্তিকা, উপবন বা কালনী এক্সপ্রেসে সিলেট যাওয়া যায়। রাতের ট্রেনে গেলে ভোরে পৌঁছে সারাদিন হাতে রেখে রাতারগুল ঘুরে আসা যায়।
ঢাকা থেকে সিলেট বাসে: ঢাকার ফকিরাপুল বা সায়েদাবাদ থেকে হানিফ, শ্যামলী, গ্রিনলাইন পরিবহনের বাস সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নিয়মিত চলে। নন-এসি বাসের ভাড়া সাধারণত ৬০০-১০০০ টাকা।
সিলেট শহর থেকে রাতারগুল: সিলেট শহর থেকে সিএনজি বা প্রাইভেট কারে রাতারগুলের ঘাট পর্যন্ত যেতে হয়। দুটো প্রধান ঘাট আছে, মাঝের ঘাট আর চৌরঙ্গি ঘাট। সিএনজিওয়ালাকে বলে রাখুন যে ঘাটে নৌকা ভাড়া কম সেখানেই নামিয়ে দিতে।
মাঝের ঘাট থেকে সরকার নির্ধারিত নৌকা ভাড়া যাওয়া-আসা প্রায় ১,৫০০ টাকা। চৌরঙ্গি ঘাট থেকে তুলনামূলক কম, ৭০০-৮০০ টাকার মধ্যেই নৌকা পাওয়া যায়। মাঝিরা প্রায়ই “তিন স্পট দেখাব” বলে বেশি টাকা চাইবে, এসবে পাত্তা না দিয়ে সরাসরি ওয়াচ টাওয়ার ঘুরিয়ে ফিরে আসার কথা বলে দিন।
প্রবেশ মূল্য
রাতারগুল একটি বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা, তাই প্রবেশের জন্য সরকার নির্ধারিত ফি দিতে হয়। প্রাপ্তবয়স্ক দেশি দর্শনার্থীদের জন্য জনপ্রতি ৫০ টাকা, ১২ বছরের কম শিশুদের জন্য ২৫ টাকা, বিদেশি পর্যটকদের জন্য প্রবেশ ফি ৫০০ টাকা দিতে হয়। গাড়ি পার্কিংয়ের জন্যও আলাদা ফি আছে, সিএনজি বা মোটরসাইকেলের জন্য ২৫ টাকা, প্রাইভেট কার বা মাইক্রোবাসের জন্য ১০০ টাকা।
কোথায় খাবেন
রাতারগুলের ঘাট এলাকায় বড় কোনো রেস্তোরাঁ নেই। ছোট খাবারের দোকানে চা-বিস্কুট বা হালকা নাশতা পাওয়া যায়। ভারী খাবারের জন্য সিলেট শহরেই খাওয়া ভালো। রাতারগুলে প্রবেশের আগে আগে খেয়ে নিতে পারেন, বা ফেরার পথে শহরে খেয়ে নিতে পারেন। সিলেট শহরে পাঁচভাই রেস্তোরাঁ, পান্ডা রেস্তোরাঁ, পালকি রেস্তোরাঁ রয়েছে। সিলেটের সাতকরা দিয়ে রান্না করা মাছ বা মুরগি একবার হলেও খেয়ে দেখতে পারেন।
কোথায় থাকবেন
রাতারগুল মূলত দিনের বেলার ট্রিপ। সকালে সিলেট থেকে বের হয়ে বিকেলের মধ্যে ফিরে আসা যায়। রাতারগুলে রাত্রিযাপনের আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই। থাকার জন্য সিলেট শহরকেই বেছে নিতে হবে। লালাবাজার ও দরগা রোড এলাকায় ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকার মধ্যে মানসম্মত আবাসিক হোটেল পাওয়া যায়।
আশেপাশে আর কি কি দেখবেন
- জাফলং
- বিছানাকান্দি
- লালাখাল
- ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর
- হযরত শাহজালাল (রহ.) এর মাজার
রাতারগুল ভ্রমণের টিপস
- বর্ষায় (জুন-অক্টোবর) গেলেই রাতারগুলের আসল রূপ দেখা যায়, শীতে পানি কমে যাওয়ায় অনুভূতিটা অনেকটাই ফিকে হয়ে যায়।
- সিএনজি থামার আগে চালককে বলে রাখুন কোন ঘাটে নৌকা ভাড়া কম, এতে অনেকটা টাকা বাঁচানো যায়।
- মাঝিরা একাধিক স্পট দেখানোর প্রলোভন দিয়ে বাড়তি টাকা চাইতে পারে, সরাসরি ওয়াচ টাওয়ার ঘুরিয়ে ফেরার কথা বলে দিন।
- দল বেঁধে গেলে নৌকা ও সিএনজি ভাড়া কম পরবে, একা বা দুজনে গেলে খরচ বেশি পড়ে।
- সকালে রওনা দিন, কারণ দুপুরের আগে পৌঁছালে রোদ কম থাকে আর নৌকায় বসে থাকাটাও আরামদায়ক।
- বনের ভেতরে গাছের ডালপালা গায়ে লাগতে পারে, তাই হালকা পোশাক পরে যাওয়া ভালো।
- বনের ভেতরে কোনো খাবারের দোকান নেই, সাথে পানি ও শুকনো খাবার নিয়ে যান।
- জলাবনে চিৎকার বা জোরে শব্দ করবেন না, এটা সংরক্ষিত এলাকা এবং পাখি-প্রাণীর জন্য বিরক্তির কারণ হতে পারে।
- একই দিনে জাফলং বা বিছানাকান্দি যোগ করতে চাইলে খুব ভোরে বেরিয়ে পড়ুন, না হলে সময়ের চাপে কোনো একটা জায়গা তাড়াহুড়ো করে দেখতে হবে।
ফেসবুক: Kuhudak

