নীলাচল পর্যটন কেন্দ্র (Nilachal Tourist Center), বাংলাদেশের বান্দারবান জেলার নীলাচল-এ অবস্থিত। এটি বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৫-৬ কিলোমিটার দূরে টাইগারপাড়া এলাকার একটি পাহাড়চূড়ায় গড়ে তোলা হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ১,৬০০-২,০০০ ফুট। নীলাচলকে অনেকেই “বাংলার দার্জিলিং” বলে থাকেন। চারপাশে সারি সারি পাহাড়, আঁকাবাঁকা রাস্তা, পাহাড়ি পাড়া আর দূরে রূপালি নদীর রেখা, এই পুরো ল্যান্ডস্কেপটাই নীলাচল থেকে একসাথে দেখা যায়। ঢাকা থেকে দূরত্ব প্রায় ৩০০ কিলোমিটারের মতো।
বান্দরবান শহরে পা রাখলেই সবার আগে যে নামটা কানে আসে সেটা নীলাচল। আর কারণটাও স্পষ্ট। শহর থেকে মিনিট দশ-পনেরোর দূরত্বেই পাহাড়ের চূড়ায় উঠে গেলে পুরো বান্দরবান শহরটাকে এক নজরে দেখার সুযোগ মিলে যায়। সকালে মেঘ এসে পাহাড়ের ঢালে আটকে থাকে, বিকেলে সূর্য রং বদলাতে বদলাতে পাহাড়ের ওপারে ডুবে যায়। এই দুটো দৃশ্যের জন্যই নীলাচল বান্দরবান ভ্রমণের তালিকায় প্রথম দিকেই থাকে।
আরও: ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর
কী কী দেখবেন
বান্দরবান শহরের প্যানারোমিক দৃশ্য: নীলাচলের পাহাড়চূড়া থেকে নিচে তাকালে পুরো বান্দরবান শহরটা একসাথে দেখা যায়, ছোট ছোট বাড়িঘর, সাঙ্গু নদীর বাঁক, দূরের পাহাড়শ্রেণি। এই উঁচু থেকে দেখা দৃশ্যটাই দর্শনার্থীদের কাছে নীলাচলকে আকর্ষণীয় করেছে।
সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত: নীলাচল থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়, তবে বিকেলের দৃশ্যটা অনেকের কাছে বেশি প্রিয়। আকাশ লাল-কমলা হয়ে পাহাড়ের ওপারে সূর্য ডুবে যাওয়ার মুহূর্তটা মিস করার মতো না।
মেঘের খেলা: ভোরবেলা বা বর্ষার পরপর গেলে মেঘ এসে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসে, কখনো কখনো পর্যটন কেন্দ্রটাই মেঘে ঢাকা পড়ে যায়। হাত বাড়িয়ে মেঘ ছোঁয়ার অনুভূতিটা নীলাচলেই সবচেয়ে ভালো পাওয়া যায়।
বিশ্রামাগার ও ভিউ পয়েন্ট: পর্যটকদের সুবিধার জন্য কয়েকটি বিশ্রামাগার ও রিসোর্ট আছে। বিভিন্ন কোণ থেকে পাহাড় ও শহরের দৃশ্য দেখার জন্য আলাদা আলাদা ভিউ পয়েন্টও আছে।
ভ্রমণের সেরা সময়
নীলাচল পর্যটন কেন্দ্র ভ্রমণের সেরা সময় হচ্ছে, অক্টোবর থেকে মার্চ মাস। শীতের এই সময়টা নীলাচল ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক। আকাশ পরিষ্কার থাকে, দৃষ্টিসীমা বেশি থাকে, ফলে দূরের পাহাড়শ্রেণিও স্পষ্ট দেখা যায়।
বর্ষার ঠিক পরে (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) গেলে মেঘের খেলা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, তবে বর্ষায় রাস্তা পিচ্ছিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। মেঘ দেখতে চাইলে খুব সকালে যাওয়া জরুরি, বেলা বাড়লে মেঘ কেটে যায়।
কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বান্দরবান বাসে (সরাসরি): ঢাকার ফকিরাপুল, সায়েদাবাদ বা কলাবাগান থেকে শ্যামলী, সৌদিয়া, এস.আলম, ইউনিক, সেন্ট মার্টিন পরিবহন বান্দরবানের সরাসরি বাস চালায়। নন-এসি বাসের ভাড়া ৮০০-৯০০ টাকা, এসি বাসে ১,২০০-১,৮০০ টাকা। রাত ৯-১০টায় ঢাকা থেকে রওনা দিলে সকাল ৭টার মধ্যে বান্দরবান পৌঁছানো যায়।
ট্রেন বা ফ্লাইটে চট্টগ্রাম হয়ে: ঢাকা থেকে ট্রেন বা ফ্লাইটে চট্টগ্রাম গিয়ে সেখান থেকে বাসে বান্দরবান যাওয়া যায়। চট্টগ্রামের বদ্দারহাট থেকে পূবালী বা পূর্বানী বাসে জনপ্রতি ভাড়া ২২০-৩০০ টাকার মতো।
বান্দরবান শহর থেকে নীলাচল: শহর থেকে সিএনজি, চান্দের গাড়ি বা জিপে নীলাচল যাওয়া যায়। সিএনজি ভাড়া অবস্থান ও সময় অনুযায়ী ৫০০-১,০০০ টাকা, জিপ ৮০০-১,২০০ টাকা, চান্দের গাড়ি ১,০০০-২,০০০ টাকা। ভাড়া করার আগে দরদাম করে নেওয়া ভালো। নীলগিরি, মেঘলা, স্বর্ণমন্দিরের মতো অন্য স্পটগুলোর সাথে একই গাড়িতে একদিনে নীলাচলও ঘুরে নেওয়া যায়, এতে খরচ ভাগ হয়ে যায়।
প্রবেশ মূল্য ও সময়সূচী
নীলাচলে প্রবেশ করতে হলে আপনাকে টিকিট কাটতে হবে। এখানে জনপ্রতি প্রবেশ মূল্য ৫০ টাকা করে। সাধারণত পর্যটকরা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নীলাচলে থাকতে পারেন। সন্ধ্যার পর শুধুমাত্র যারা ভেতরের রিসোর্টে রাত্রিযাপন করেন তাদেরই থাকার অনুমতি দেওয়া হয়।
কোথায় খাবেন
নীলাচলে ভালো মানের রেস্তোরাঁর সংখ্যা সীমিত। ফরেস্ট হিল নামে একটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে। নীলাচল স্কেপ রিসোর্টে রাত্রিযাপন করলে কর্তৃপক্ষ খাবারের ব্যবস্থা করে দেয়। বেশিরভাগ পর্যটক বান্দরবান শহর থেকে হালকা খাবার নিয়ে যান, বা নীলাচল দেখা শেষে শহরে ফিরে খেয়ে নেন। বান্দরবান শহরে খাবারের জন্য বেশ কিছু পরিচিত রেস্টুরেন্ট আছে যেখানে ভাত-মাছ-মাংসের সাধারণ মেনু থেকে পাহাড়ি খাবার পর্যন্ত পাওয়া যায়।
কোথায় থাকবেন
নীলাচলের ভেতরেই কয়েকটি রিসোর্ট আছে যেখানে রাত্রিযাপন করা যায়। পাহাড়ের উপর রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা যারা চান তাদের জন্য এটা একটা ভালো অপশন। তবে বেশিরভাগ পর্যটক বান্দরবান শহরেই থাকেন। শহরে বাজেট থেকে মাঝারি বাজেটের অনেক হোটেল আছে। হোটেল হিল ভিউ (ভাড়া ১,২০০-২,৫০০ টাকা), হোটেল হিলটন (১,২০০-৩,০০০ টাকা), হোটেল প্লাজা (১,০০০-৩,০০০ টাকা, বাস স্ট্যান্ড থেকে ৫ মিনিট হাঁটা পথ), রিভার ভিউ (সাঙ্গু নদীর পাশে, ৬০০-২,০০০ টাকা)। শহর থেকে নীলাচল কাছেই, তাই সকালে বা বিকেলে গিয়ে ফিরে আসা সহজ।
আশেপাশে আর কি কি দেখবেন
বান্দরবান শহরের আশেপাশেই বেশ কয়েকটা দর্শনীয় স্থান আছে যেগুলো নীলাচলের সাথে একই দিনে ঘুরে নেওয়া যায়।
- মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্স
- স্বর্ণমন্দির (বুদ্ধ ধাতু জাদি)
- চিম্বুক পাহাড়
- নীলগিরি
- শৈলপ্রপাত ঝর্ণা
- ডাবল হ্যান্ড ভিউ পয়েন্ট
- সুখিয়া ভ্যালি
নীলাচল ভ্রমণের টিপস
- মেঘ দেখতে চাইলে ভোর থাকতে থাকতেই নীলাচলে পৌঁছান, বেলা বাড়লে মেঘ কেটে যায়।
- বিকেলের সূর্যাস্ত দেখতে গেলে অন্তত এক-দুই ঘণ্টা আগে গিয়ে জায়গা নিয়ে বসুন, ভালো ভিউ পয়েন্টগুলোতে ভিড় হয়ে যায়।
- সিএনজি, জিপ বা চান্দের গাড়ি ভাড়া করার আগে অবশ্যই দরদাম করে নিন, সময় ও সিজন ভেদে ভাড়া ওঠানামা করে।
- একই গাড়িতে নীলাচলের সাথে মেঘলা বা স্বর্ণমন্দিরও ঘুরে আসতে পারেন।
- সাপ্তাহিক ছুটির দিনে (শুক্র-শনি) প্রচুর ভিড় হয়, নিরিবিলি অনুভূতি পেতে চাইলে সপ্তাহের মাঝামাঝি কোনো দিন বেছে নিন।
- নীলাচলে রেস্তোরাঁর সংখ্যা সীমিত, তাই শহর থেকে হালকা খাবার বা পানি সাথে নিয়ে যাওয়া ভালো।
- পাহাড়ের উপরে বাতাস বেশ ঠান্ডা থাকে, বিশেষ করে শীতে ও সন্ধ্যার দিকে, সাথে হালকা গরম কাপড় রাখুন।
- ভালো ছবি তুলতে চাইলে সকাল বা বিকেলের সোনালি আলোর সময়টা বেছে নিন, দুপুরের কড়া আলোয় দৃশ্য সমতল লাগে।
- রাতে পাহাড়ে থাকতে চাইলে নীলাচলের ভেতরের রিসোর্ট আগেভাগে বুকিং করে রাখুন, না হলে সন্ধ্যার পর প্রবেশের অনুমতি মিলবে না।
- পাহাড়ি রাস্তা ও সিএনজি/জিপের গতির কারণে বমি ভাব হতে পারে এমন কারো সাথে গেলে আগে থেকে ওষুধ সাথে রাখুন।
- একা একা গহীনে যাবেন না।
ফেসবুক: Kuhudak

