ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর (Bholaganj Shada Pathor), বাংলাদেশের সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষে আছে। সিলেট গেলে মানুষ সাধারণত জাফলং, রাতারগুল, বিছানাকান্দির কথা ভাবে। কিন্তু ধলাই নদীর বুকে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার সাদা পাথর, একটু উপরে মেঘালয়ের পাহাড়ের সবুজ দেয়াল, আর চারপাশে পাহাড়ি নদীর নিস্তব্ধতা, এই দৃশ্যটা একবার চোখে পড়লে সহজে মাথা থেকে যায় না। বর্ষায় এলে নৌকায় ভেসে ভেসে যাওয়া যায় পাথরের মাঝে। শীতে পানি কমে গেলে পাথরের উপর দিয়ে হাঁটা যায় অনেক দূর পর্যন্ত।
আরও: জাফলং
ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর কোথায় অবস্থিত
সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের একেবারে কাছে ধলাই নদীর তীরে ভোলাগঞ্জের অবস্থান। মেঘালয়ের খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে প্রতি বর্ষায় ঢল নামে, আর সেই ঢলের সাথে অসংখ্য পাথর ভেসে আসে ধলাই নদীতে। বর্ষার পর নদীর বুকে স্তূপ হয়ে পড়ে থাকা এই পাথরগুলোই হলো ভোলাগঞ্জের মূল আকর্ষণ। জায়গাটি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পাথর কোয়ারি এলাকা হিসেবেও পরিচিত, এবং সীমান্তের জিরো পয়েন্টে একটি ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশনও আছে। সিলেট শহর থেকে ভোলাগঞ্জের দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার।
কী কী দেখবেন
সাদা পাথরের বিস্তার: ধলাই নদীর দুপারে অগনীত সাদা পাথর ছড়িয়ে আছে। বর্ষায় পানির নিচে থাকে, কিন্তু ভাটার সময় পাথরের উপর পানির পাতলা স্তর থাকে সেই স্বচ্ছ পানিতে নিজের ছবি দেখা যায়। ফটোগ্রাফারদের জন্য এই দৃশ্যটা স্বর্গের মতো।
মেঘালয়ের পাহাড়: নদীর ওপারে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়গুলো সরাসরি চোখে পড়ে। পাহাড়ের গায়ে মেঘ ঝুলতে দেখা যায়, বর্ষায় একাধিক ছোট ঝরনাও দেখা যায় দূর থেকে। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখার অনুভূতিটা বিশেষ।
নৌকা ভ্রমণ: বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে ধলাই নদীতে পর্যাপ্ত পানি থাকে, তখন নৌকায় চেপে পাথরের মাঝে ঘুরে বেড়ানো যায়। ভোলাগঞ্জ ঘাট থেকে রিজার্ভ নৌকা করতে হয়, এক নৌকায় সর্বোচ্চ ৮-১০ জন বসা যায়।
পায়ে হাঁটার আনন্দ: শীতকালে পানি কমে গেলে নৌকা চলে না। তখন পায়ে হেঁটে পাথরের উপর দিয়ে অনেক দূর যাওয়া যায়, এই অভিজ্ঞতাটা আলাদাই সুন্দর।
চুনাপাথর আমদানির দৃশ্য: জিরো পয়েন্টের কাস্টমস স্টেশন দিয়ে প্রতিদিন শত শত ট্রাক ভারত থেকে চুনাপাথর নিয়ে প্রবেশ করে। এই কর্মব্যস্ত দৃশ্যটা দেখতেও অনেকের কাছে দারুণ লাগে।
আরও: টাঙ্গুয়ার হাওর
ভ্রমণের সেরা সময়
ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর দেখার সবচেয়ে ভালো সময় হলো জুন থেকে নভেম্বর। বর্ষায় নদীতে পানি থাকে, নৌকায় ঘুরে বেড়ানো যায়, পাহাড়ের গায়ে ঝরনাও দেখা যায়। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে পানি কিছুটা কমলেও নৌকা চলে, আর পাথরগুলো পানির উপরে উঠে আসতে শুরু করে, এই সময়টাই ছবি তোলার জন্য সেরা।
কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে ট্রেনে সিলেট: ঢাকার কমলাপুর থেকে সিলেটগামী উপবন এক্সপ্রেস, পারাবত এক্সপ্রেস, জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ও কালনী এক্সপ্রেস নিয়মিত চলে। রাতের ট্রেনে গেলে ভোরে সিলেট পৌঁছানো যায়, তারপর সরাসরি ভোলাগঞ্জ রওনা।
ঢাকা থেকে বাসে সিলেট: ঢাকার ফকিরাপুল বা সায়দাবাদ থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে নন-এসি বাসে ভাড়া ১,৪০০ টাকার মতো। এনা, শ্যামলী, হানিফ বেশ কয়েকটা পরিবহন এই রুটে চলে।
সিলেট থেকে বাসে ভোলাগঞ্জ: সিলেটের আম্বরখানা বা মজুমদারী এলাকা থেকে ভোলাগঞ্জের উদ্দেশ্যে বিআরটিসি ও লোকাল বাস চলে সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। বাস ভাড়া মজুমদারী থেকে জনপ্রতি প্রায় ১৫০ টাকা।
সিলেট থেকে সিএনজিতে ভোলাগঞ্জ: আম্বরখানা থেকে লোকাল সিএনজিতে জনপ্রতি ২২০-২৮০ টাকা। সারা দিনের জন্য রিজার্ভ করলে যাওয়া-আসা ২,০০০-২,৫০০ টাকার মধ্যে হয়। একদিনে উৎমাছড়া-তুরংছড়াসহ একাধিক স্পট ঘুরতে চাইলে সারাদিনের জন্য সিএনজি রিজার্ভ করাটাই স্মার্ট।
টুকের বাজার হয়ে: সিলেট থেকে অটোরিকশায় টুকের বাজার (জনপ্রতি ২০০ টাকা), সেখান থেকে ট্রলারে ভোলাগঞ্জ।
নৌকা ভাড়া: ভোলাগঞ্জ থেকে সাদা পাথর এলাকায় ঘুরে আসার জন্য রিজার্ভ নৌকা ভাড়া ৮০০ থেকে ১,৫০০ টাকা (নৌকাপ্রতি, ৮-১০ জন ধারণক্ষমতা)। দরদাম করে নেওয়া যায়।
কোথায় খাবেন
ভোলাগঞ্জ বাজার, দয়ারবাজার ও চরারবাজার এলাকায় মানসম্মত কোনো রেস্তোরাঁ নেই। সাধারণ মানের স্থানীয় খাবার হোটেলে ভাত, মাছ, মাংস পাওয়া যায়। ভারী খাবারের চেয়ে সকালে ভালো করে খেয়ে বের হওয়া এবং সাথে শুকনো খাবার রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। ফেরার পথে সিলেট শহরে ভালো খাবারের অনেক অপশন আছে। সিলেটে পান্ডা রেস্তোরাঁ, পাঁচভাই রেস্তোরাঁ, পালকি রেস্তোরাঁ পরিচিত নাম। সিলেটে এলে সাতকরার ঘ্রাণে রান্না করা মুরগি বা মাছের তরকারি একবার খেয়ে দেখার মতো।
আরও: বাইক্কা বিল
কোথায় থাকবেন
ভোলাগঞ্জ সাদা পাথরে এখন নতুন সাদা পাথর হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট তৈরি হয়েছে। একেবারে সাদা পাথরের কাছেই থাকতে পারবেন, রিসোর্ট থেকে গাইডেড ট্যুরেরও ব্যবস্থা আছে। তবে বেশিরভাগ মানুষ সিলেট শহরে ফিরে রাতে থাকেন। দিনের বেলা ভোলাগঞ্জ সেরে বিকেলে সিলেট ফিরে আসা যায়। সিলেটে থাকার জন্য লালাবাজার ও দরগা রোড এলাকায় ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকায় মানসম্মত আবাসিক হোটেল পাওয়া যায়। হোটেল হিল টাউন, গুলশান, দরগা গেইট, সুরমা বিভিন্ন বাজেটের অপশন আছে।
আশেপাশে আরও কি কি দেখবেন
ভোলাগঞ্জ এলে পাশের জায়গাগুলো একই দিনে অথবা একই ট্রিপে ঘুরে আসতে পারেন।
- উৎমাছড়া
- তুরংছড়া
- লাক্কাতুর চা বাগান
- পান্থুমাই ঝর্ণা
- বিছানাকান্দি
- রাতারগুল জলাবন
ফেসবুক: Kuhudak
