নুহাশ পল্লী (Nuhash Polli), বাংলাদেশের ঢাকা বিভাগের গাজীপুর জেলার হোতাপাড়া ইউনিয়নের পিরুজালী গ্রামে অবস্থিত। এটি গাজীপুর সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ১৯৯৭ সালে হুমায়ূন আহমেদ নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ৪০ বিঘা জমির উপর এই বাগানবাড়ি গড়ে তোলেন। নিজের বড় ছেলে নুহাশের নামে রাখা হয় এই জায়গার নাম। জনমানবহীন জঙ্গলের মাঝে এক টুকরো সাজানো নন্দনকানন এটাই নুহাশ পল্লীর প্রথম পরিচয়।
বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের কাছে এই স্থানটি একটি আবেগময় স্থান। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ নিজের হাতে, নিজের ভালোবাসায় গড়ে তুলেছিলেন এই বাগানবাড়ি। যারা হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়ে বড় হয়েছেন, তাদের জন্য এখানে আসা মানে যেন সরাসরি তার গল্পের ভেতরে ঢুকে পড়া।
কী কী দেখবেন
হুমায়ূন আহমেদের সমাধি: এটি নুহাশ পল্লীর সবচেয়ে আবেগময় জায়গা। পুরনো লিচু গাছের নিচে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন বাংলা সাহিত্যের এই কিংবদন্তি। কবর জিয়ারতের জন্য মূল গেটের বাইরে আলাদা একটা গেট আছে, সেখান দিয়ে কোনো প্রবেশ ফি ছাড়াই সবাই যেতে পারেন।
লীলাবতী দীঘি: পল্লীর উত্তর প্রান্তে এই দীঘির মাঝখানে একটা কৃত্রিম দ্বীপ আছে, যেটার সাথে কাঠের সাঁকো দিয়ে সংযুক্ত করা। দীঘির পাড়ে বসে সময় কাটানোটাই এখানকার সবচেয়ে শান্তিময় অভিজ্ঞতার একটি।
ভূতবিলাস ও বৃষ্টিবিলাস কটেজ: হুমায়ূন আহমেদের নিজের রুচিতে সাজানো দুটো কটেজ। বৃষ্টিবিলাসের টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শোনার জন্যই বিশেষভাবে তৈরি, আর ভূতবিলাসে রাতে বসে থাকলে ভূতের দেখা মিলবে এমনটাই বলতেন তিনি নিজে।
ঔষধি গাছের বাগান: বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঔষধি গাছের বাগানগুলোর একটি এখানে আছে, প্রায় ৩০০ প্রজাতির দুর্লভ ভেষজ, মসলা, ফলজ ও বনজ গাছ। হুমায়ূন আহমেদের গাছের প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রতিফলন এই বাগানে স্পষ্ট।
ভাস্কর্য ও স্থাপনা: মা ও ছেলের ভাস্কর্য, পাথরের মৎস্যকন্যা, রাক্ষস ও ডাইনোসরের মূর্তি, এবড়োখেবড়ো আকারের সুইমিং পুল, সব মিলিয়ে পুরো জায়গাটাই যেন একজন শিল্পীর কল্পনার জগৎ।
হোয়াইট হাউজ: হুমায়ূন আহমেদ যেখানে থাকতেন, সেই ঘর। সামনে তার একটা বড় ম্যুরালও আছে। তার চরিত্রগুলো যেন এখানকার প্রতিটি কোণায় জীবন্ত হয়ে আছে।
ভ্রমণের সেরা সময়
নুহাশ পল্লী ভ্রমণের সেরা সময় হচ্ছে, এপ্রিল থেকে নভেম্বর মাস। এই সময়টায় নুহাশ পল্লী সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য প্রতিদিন খোলা থাকে। ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত মূলত স্কুল-কলেজ বা প্রতিষ্ঠানের পিকনিকের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়, তখন সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ সীমিত থাকে।
এখানে বছরে দুটো দিন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৩ নভেম্বর (হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন) এবং ১৯ জুলাই (মৃত্যুদিন)। এই দুই দিন নুহাশ পল্লী সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে, কোনো প্রবেশ ফিও লাগে না। তবে এই দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের ভিড় সবচেয়ে বেশি থাকে।
প্রবেশ মূল্য
নুহাশ পল্লীতে প্রবেশের জন্য আগে থেকে কোনো অনুমতি লাগে না। সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশ ফি জনপ্রতি ২০০ টাকা। ছোট শিশু, গাড়ির চালক এবং গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য কোনো ফি লাগে না। এই টাকা মূলত হুমায়ূন আহমেদ প্রতিষ্ঠিত নেত্রকোনার শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠের ব্যয় নির্বাহে ব্যবহৃত হয়। হুমায়ূন আহমেদের কবর জিয়ারতের জন্য আলাদা কোনো প্রবেশ ফি নেই, মূল গেটের বাইরে বাম পাশের গেট দিয়ে সরাসরি ঢোকা যায়।
কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে হোতাপাড়া: আপনি ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রথমে গাজীপুর চৌরাস্তা আসতে আসবেন। চৌরাস্তা থেকে ময়মনসিংহ রোড ধরে হোতাপাড়ার দিকে যেতে হয়। ঢাকা থেকে সরাসরি ময়মনসিংহ বা কাপাসিয়াগামী বাসে উঠেও হোতাপাড়ায় নামা যায়। ভাড়া নিতে পারে ৫০-১০০ টাকা।
হোতাপাড়া থেকে নুহাশ পল্লী: হোতাপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে নুহাশ পল্লী প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে। সিএনজি, টেম্পো বা অটোরিকশায় যাওয়া যায়। সিএনজি ভাড়া ১২০-১৫০ টাকা, টেম্পোতে ৪০-৫০ টাকা, অটোরিকশায় ৫০-৬০ টাকা নিতে পারে।নিজের গাড়ি থাকলে সরাসরি ড্রাইভ করেও যাওয়া যায়, এখানের রাস্তা বেশ ভালো।
আরও: রাজমনি পিরামিড
কোথায় খাবেন
নুহাশ পল্লীর ভেতরে বাইরে থেকে খাবার নিয়ে ঢোকায় কোনো বাধা নেই (নিজস্ব পিকনিক চলাকালীন সময় ছাড়া)। তাই অনেকে সাথে খাবার নিয়ে যান এবং দীঘির পাড়ে বা গাছের ছায়ায় বসে খেয়ে নেন। ভেতরে বড় কোনো রেস্তোরাঁ নেই, তাই হোতাপাড়া বাজার এলাকায় খাবারের জন্য কয়েকটি সাধারণ হোটেল আছে। তবে চাইলে সাথে শুকনো খাবার ও পানি নিয়ে যেতে পারেন।
কোথায় থাকবেন
নুহাশ পল্লী মূলত একদিনের ডে ট্রিপ এর জন্য। তাই ঢাকা থেকে সকালে বের হয়ে বিকেলেই ফিরে আসা যায়, রাত্রিযাপনের প্রয়োজন হয় না। তবে থাকতে চাইলে গাজীপুর শহরে কয়েকটি আবাসিক হোটেল ও রিসোর্ট আছে। যারা একসাথে নুহাশ পল্লী আর বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক দুটোই ঘুরতে চান, তারা গাজীপুরেই এক রাত থাকার পরিকল্পনা করতে পারেন।
আশেপাশে আর কি কি দেখবেন
নুহাশ পল্লীর আশেপাশে কয়েকটা জায়গা আছে যেগুলো একই ট্রিপে ঘুরে দেখা সম্ভব।
- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক
- ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান
নুহাশ পল্লী ভ্রমণের টিপস
- ১৩ নভেম্বর ও ১৯ জুলাই ছাড়া অন্য কোনো দিন গেলে প্রবেশ ফি ২০০ টাকা মাথায় রাখুন।
- ডিসেম্বর থেকে মার্চ পিকনিক সিজন, এই সময় যাওয়ার আগে ফোনে খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিন সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশ খোলা আছে কিনা।
- হোতাপাড়া বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছানোর পর সিএনজি বা রিকশায় ভাড়া আগেই ঠিক করে নিন, এতে দরদাম নিয়ে সময় নষ্ট হবে না।
- সাথে হালকা খাবার ও পানি নিয়ে যান, ভেতরে বড় রেস্তোরাঁ নেই।
- সমাধি জিয়ারত করতে চাইলে মূল গেটের বদলে বাম পাশের আলাদা গেট দিয়ে ঢুকুন, এতে প্রবেশ ফি লাগবে না।
- হুমায়ূন আহমেদের লেখার সাথে পরিচিত থাকলে ঘুরতে ঘুরতে তার উপন্যাস-নাটকের প্রসঙ্গগুলো মনে করার চেষ্টা করুন, অভিজ্ঞতাটা আরও সমৃদ্ধ লাগবে।
- সকালে রওনা দিলে দিনের আলোয় বাগান, দীঘি ও স্থাপনাগুলো ভালোভাবে দেখা ও ছবি তুলতে পারবেন।
- একই দিনে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক যুক্ত করতে চাইলে সময়ের হিসাব রেখে সকাল সকাল বের হোন, দুটো জায়গা ভালোভাবে দেখতে পুরো দিন লাগতে পারে।
- বাগানের ভেতরে নীরবতা ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন, এটা একজন প্রিয় লেখকের স্মৃতিবিজড়িত জায়গা।
- ভিড় এড়াতে চাইলে সাপ্তাহিক ছুটির দিন বা হুমায়ূন আহমেদের জন্ম-মৃত্যুদিনের বদলে সপ্তাহের অন্য কোনো দিন বেছে নিন।
ফেসবুক: Kuhudak

