ট্যুর এন্ড ট্রাভেলস ব্যবসা বলতে বোঝায় এমন একটা ব্যবসা, যেখানে একজন উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠান মানুষের ভ্রমণের পুরো ঝামেলাটা নিজের কাঁধে তুলে নেয়। মানুষ যখন কোথাও ঘুরতে যেতে চায়, তখন তার সামনে অনেক প্রশ্ন থাকে, কোথায় থাকবে, কীভাবে যাবে, খরচ কেমন হবে, নিরাপদ কিনা। ট্যুর অপারেটর বা ট্রাভেল এজেন্সি ঠিক এই জায়গাগুলোতেই সমাধান দেয়। তারা ট্যুর প্ল্যান করে, হোটেল বুকিং করে, পরিবহনের ব্যবস্থা করে, গাইড দেয়, আর অনেক সময় পুরো প্যাকেজ বানিয়ে দেয় যাতে গ্রাহককে শুধু ব্যাগ গুছিয়ে বের হলেই চলে। সহজ কথায় বললে, একজন মানুষ যা যা নিজে করতে গেলে সময় আর পরিশ্রম দুটোই বেশি লাগতো, সেই কাজটাই একটা এজেন্সি অভিজ্ঞতা আর নেটওয়ার্ক দিয়ে অনেক সহজ করে দেয়।
আরও: ভ্রমণ ফোরাম বা কমিউনিটি কি
কীভাবে কাজ করে এই ব্যবসা
একটা ট্যুর এন্ড ট্রাভেলস ব্যবসা মূলত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে। হোটেল, পরিবহন কোম্পানি, রেস্তোরাঁ, গাইড, এদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে একটা এজেন্সি বিভিন্ন প্যাকেজ বানায়। কেউ হয়তো শুধু হোটেল বুকিং করে দেয়, কেউ আবার পুরো ট্যুর প্ল্যান করে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছু গুছিয়ে দেয়। কক্সবাজার, সিলেট, বান্দরবানের মতো দেশের ভেতরের ট্যুরের পাশাপাশি অনেক এজেন্সি বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজও অফার করে, যেমন ভিসা প্রসেসিং থেকে শুরু করে হোটেল, টিকিট সব একসাথে।
এই ব্যবসার মধ্যেও অনেক ভাগ আছে। কেউ শুধু বিমানের টিকিট আর ভিসা প্রসেসিং নিয়ে কাজ করে, কেউ আবার শুধু গ্রুপ ট্যুর বা অ্যাডভেঞ্চার ট্যুর নিয়ে কাজ করে। কেউ কর্পোরেট ট্রাভেল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কাজ করে, যেখানে কোনো কোম্পানির কর্মীদের অফিসিয়াল ট্যুরের পুরো ব্যবস্থাপনা তারা সামলায়। আবার হানিমুন প্যাকেজ, ধর্মীয় ভ্রমণ যেমন হজ বা ওমরাহ প্যাকেজ, এসবও আলাদা একটা বড় বাজার তৈরি করেছে। প্রতিটা ভাগেরই নিজস্ব চাহিদা আর গ্রাহকগোষ্ঠী আছে, তাই ব্যবসার শুরুতে কোন দিকে ফোকাস করবেন সেটা ঠিক করাটা জরুরি।
কেন মানুষ এজেন্সির মাধ্যমে ঘুরতে চায়
অনেকেই মনে করেন, নিজে নিজে সব প্ল্যান করে ফেলা যায়, তাহলে এজেন্সির দরকার কী। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সবার হাতে অত সময় বা অভিজ্ঞতা থাকে না। বিশেষ করে প্রথমবার কোনো জায়গায় যাচ্ছেন এমন মানুষের কাছে একটা ভালো এজেন্সি অনেক বড় ভরসার জায়গা হয়ে ওঠে। হুট করে কোনো সমস্যা হলে, যেমন ফ্লাইট মিস হয়ে গেল বা হোটেলে ঝামেলা হলো, তখন একজন এজেন্ট পাশে থাকলে সমস্যাটা দ্রুত সমাধান হয়ে যায়। এছাড়া গ্রুপ ট্যুর, হানিমুন প্যাকেজ, বা করপোরেট ট্যুরের ক্ষেত্রেও এজেন্সির ভূমিকা অনেক বড়।
বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে এই ভরসাটা আরো বেশি জরুরি হয়ে ওঠে। ভিসা আবেদনের নিয়মকানুন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, দূতাবাসের নিয়ম, এসব নিয়ে সাধারণ মানুষের তেমন ধারণা থাকে না। একজন অভিজ্ঞ এজেন্ট এই পুরো প্রক্রিয়াটা সহজ করে দেয়, ভুল কাগজপত্র জমা দিয়ে ভিসা বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও কমিয়ে দেয়। অনেক সময় গ্রুপ ডিসকাউন্ট বা বিশেষ অফারের কারণে এজেন্সির মাধ্যমে বুকিং করলে খরচও কমে যায়, যা একা একা প্ল্যান করলে পাওয়া যায় না।
ব্যবসাটা শুরু করতে কি লাগে
ট্যুর এন্ড ট্রাভেলস ব্যবসা শুরু করার জন্য প্রথমে দরকার হয় ট্রাভেল ট্রেড লাইসেন্স আর প্রয়োজনীয় নিবন্ধন, যেমন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের অনুমোদন বা ট্রাভেল এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের সদস্যপদ। এরপর দরকার হয় হোটেল, এয়ারলাইন্স, পরিবহন কোম্পানির সাথে ভালো সম্পর্ক আর নেটওয়ার্ক তৈরি করা। শুরুতে অনেকে ছোট পরিসরে শুরু করেন, একটা অফিস আর কয়েকজন কর্মী নিয়ে, তারপর ধীরে ধীরে সেটা বড় করেন। বর্তমানে অনেক এজেন্সি অনলাইন ভিত্তিক হয়ে গেছে, ওয়েবসাইট আর সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই বেশিরভাগ বুকিং হয়ে যায়।
প্রাথমিক পুঁজি হিসেবে অফিস ভাড়া, প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ফি, ওয়েবসাইট বা অ্যাপ তৈরির খরচ, আর মার্কেটিংয়ের জন্য কিছু বাজেট রাখতে হয়। এছাড়া বিশ্বস্ত সাপ্লায়ার নেটওয়ার্ক তৈরি করাটাও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভালো হোটেল আর পরিবহনের সাথে সরাসরি চুক্তি না থাকলে গ্রাহককে ভালো দামে সার্ভিস দেওয়া কঠিন হয়ে যায়। অনেক নতুন উদ্যোক্তা শুরুতে বড় কোনো এজেন্সির সাথে কাজ করে অভিজ্ঞতা নিয়ে নেন, তারপর নিজের ব্যবসা শুরু করেন, যাতে বাস্তব বাজার আর গ্রাহকের চাহিদা সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়।
কেমন আয় হয় এই ব্যবসায়
ট্যুর এন্ড ট্রাভেলস ব্যবসায় আয়ের মূল উৎস হলো কমিশন আর সার্ভিস চার্জ। হোটেল বা এয়ারলাইন্সের সাথে চুক্তির মাধ্যমে প্রতিটা বুকিংয়ে একটা কমিশন পাওয়া যায়, আবার নিজেদের তৈরি প্যাকেজে সরাসরি লাভও যোগ করা হয়। যত বেশি গ্রাহক আর যত বড় নেটওয়ার্ক, ততই ব্যবসাটা লাভজনক হয়ে ওঠে। তবে এই ব্যবসায় প্রতিযোগিতাও অনেক বেশি, তাই মানসম্মত সার্ভিস আর গ্রাহকের আস্থা অর্জন করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আয়ের আরেকটা বড় উৎস হলো কাস্টম প্যাকেজ তৈরি করা। অনেক গ্রাহক চান নিজের মতো করে একটা ট্যুর সাজাতে, যেখানে সাধারণ প্যাকেজের বাইরে গিয়ে বিশেষ কিছু যোগ করা হয়। এই ধরনের কাস্টমাইজড সার্ভিসে সাধারণত লাভের পরিমাণও বেশি থাকে। এছাড়া মৌসুমভিত্তিক চাহিদার সময়, যেমন ঈদের ছুটি বা শীতকালীন ভ্রমণ মৌসুমে, চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আয়ও বেড়ে যায়। তাই অনেক এজেন্সি বছরের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে ব্যবসা চালায়, যাতে সারা বছর একটা স্থিতিশীল আয় বজায় থাকে।
আরও: বিমান টিকিট কাটতে কি কি ডকুমেন্ট দরকার
চ্যালেঞ্জ আর সম্ভাবনা
বাংলাদেশে ট্যুর এন্ড ট্রাভেলস ব্যবসার সম্ভাবনা দিন দিন বাড়ছে, কারণ মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ঘুরতে চায়, দেশে আর বিদেশে দুই জায়গাতেই। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভ্রমণের প্রতি আগ্রহ যেভাবে বাড়ছে, তাতে এই খাতে ভবিষ্যতে আরো বেশি সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ভ্রমণের ছবি আর অভিজ্ঞতা শেয়ার করে, যা অন্যদের মধ্যেও ভ্রমণের আগ্রহ জাগিয়ে তোলে। এই প্রবণতা ট্যুর এন্ড ট্রাভেলস ব্যবসার জন্য একটা বড় সুযোগ তৈরি করছে।
তবে চ্যালেঞ্জও কম না। মৌসুমভিত্তিক চাহিদা, অনলাইন প্রতারণা নিয়ে গ্রাহকের অবিশ্বাস, আর অনেক ছোট ছোট এজেন্সির মধ্যে প্রতিযোগিতা, এসব সামলে টিকে থাকাটা সহজ কাজ না। অনেক সময় দেখা যায়, কিছু অসাধু এজেন্সি টাকা নিয়ে ঠিকমতো সার্ভিস না দেওয়ায় পুরো খাতের প্রতিই মানুষের অবিশ্বাস তৈরি হয়। এই কারণে যারা সততা আর ভালো সার্ভিস দিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করে যায়, তারাই শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের আস্থা অর্জন করে এবং টিকে থাকে। মানসম্মত সার্ভিস, স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ, আর গ্রাহকের সাথে সততাপূর্ণ যোগাযোগ, এই তিনটা জিনিস দীর্ঘমেয়াদে যেকোনো ট্যুর এন্ড ট্রাভেলস ব্যবসার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে।
ভ্রমণের জগতে যারা নতুন কিছু জানতে চান, বা কোনো এজেন্সির অভিজ্ঞতা নিয়ে অন্যদের সাথে কথা বলতে চান, তাদের জন্য আমাদের কুহুডাক কমিউনিটি একটা ভালো জায়গা। এখানে ট্যুর প্যাকেজ, এজেন্সির অভিজ্ঞতা, বা নিজের ভ্রমণ পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন করা যায়, আবার অন্যদের অভিজ্ঞতা থেকেও শেখা যায়। কারো ভালো বা খারাপ অভিজ্ঞতা অন্য কারো সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সহজ করে দিতে পারে, তাই নিজের গল্পটা শেয়ার করতে ভুলবেন না।
ফেসবুক: Kuhudak

এই পোস্টে আপনার প্রথম মন্তব্য করুন
You must be logged in to post a comment.