পাকিস্তানের সেরা ১০টি দর্শনীয় স্থান নিয়ে বিস্তারিত থাকছে এই পোস্টে। পাকিস্তান (Pakistan) দক্ষিণ এশিয়ার একটি অসাধারণ সুন্দর দেশ, যেখানে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বতমালা, প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ, সবুজ উপত্যকা এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। হিমালয়, কারাকোরাম এবং হিন্দুকুশ পর্বতমালার মিলনস্থল এই দেশটি প্রকৃতি প্রেমী এবং রোমাঞ্চ পিপাসুদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য।
প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতা থেকে শুরু করে মুঘল স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন, সব মিলিয়ে পাকিস্তান বিশ্ব ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক অনন্য গন্তব্য হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের মধ্যে পাকিস্তান ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এবং বিশ্বের সেরা উদীয়মান পর্যটন গন্তব্যগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে।
আরও: বাংলাদেশ
হুনজা ভ্যালি (Hunza Valley)
হুনজা ভ্যালি পাকিস্তানের গিলগিট-বালতিস্তান অঞ্চলে অবস্থিত একটি অত্যাশ্চর্য সুন্দর উপত্যকা যা অনেকের কাছে “পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর স্থান” হিসেবে বিবেচিত। প্রায় ২৫০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই উপত্যকাটি তিনটি প্রধান পর্বতমালা – কারাকোরাম, হিমালয় এবং হিন্দুকুশের মিলনস্থলে অবস্থিত। প্রাচীন ভ্রমণকারীরা এই স্থানকে “শাংরি-লা” বা কল্পনার স্বর্গভূমি নাম দিয়েছিলেন, যা আজও এর সৌন্দর্যের যথার্থ প্রকাশ।
হুনজা ভ্যালির প্রধান আকর্ষণ হলো এর চোখ ধাঁধানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। রাকাপোশি পর্বত (৭,৭৮৮ মিটার) তার মহিমা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে উপত্যকার উপরে, যা স্থানীয়ভাবে “গায়ক পাহাড়” নামে পরিচিত কারণ বাতাস যখন এর বরফাবৃত ঢাল বেয়ে বয়ে যায়, তখন এক সুমধুর শব্দের সৃষ্টি হয়। আট্টাবাদ লেক ২০১০ সালে একটি ভূমিধসের ফলে সৃষ্টি হয়েছিল এবং এই হ্রদের ফিরোজা নীল জল এবং চারপাশের পর্বতশৃঙ্গ এক অবিশ্বাস্য দৃশ্যের অবতারণা করে।

হুনজার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে বালতিত ফোর্ট এবং আলতিত ফোর্ট উল্লেখযোগ্য। বালতিত ফোর্ট প্রায় ৮০০ বছরের পুরোনো এবং এক সময় হুনজার রাজপরিবারের বাসস্থান ছিল। দুর্গটি এখন একটি জাদুঘর এবং এর থেকে পুরো কারিমাবাদ শহর এবং রাকাপোশি পর্বতের অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়। হুসাইনি ব্রিজ গিলগিট-বালতিস্তানের দীর্ঘতম ঝুলন্ত সেতুগুলোর একটি এবং একসময় “বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক সেতু” হিসেবে পরিচিত ছিল।
খুনজেরাব পাস হুনজা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে পাকিস্তান এবং চীনের সীমানায় অবস্থিত। ৪,৭৩৩ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এটি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু পাকা সড়ক সীমান্ত ক্রসিং। পাসু কোনস বা পাসু ক্যাথেড্রাল সোশ্যাল মিডিয়ায় পাকিস্তানের সবচেয়ে ফটোগ্রাফিক পর্বতশৃঙ্গ হিসেবে বিবেচিত এবং এই ত্রিভুজাকার পর্বতচূড়াগুলো এক অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রকাশ।
হুনজার মানুষ তাদের আতিথেয়তা এবং দীর্ঘায়ুর জন্য বিখ্যাত। এখানকার অধিবাসীরা ইসমাইলি মুসলিম, যারা তুলনামূলকভাবে উদার এবং অতিথিপরায়ণ। হুনজার খাবার, বিশেষত শুকনো ফল এবং হুনজা পানি, স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী বলে মনে করা হয়। শরৎকাল (অক্টোবর-নভেম্বর) হুনজা ভ্যালি ভ্রমণের সবচেয়ে জাদুকরী সময় যখন পুরো উপত্যকা সোনালি, কমলা এবং লাল রঙের পাতায় ভরে যায়।
আরও: সৌদি আরবের সেরা ১০টি দর্শনীয় স্থান
স্কার্দু (Skardu)
স্কার্দু গিলগিট-বালতিস্তান অঞ্চলের একটি পাহাড়ি শহর এবং উত্তর পাকিস্তানের “ট্রেকিং ক্যাপিটাল” হিসেবে পরিচিত। এটি কে২ এবং অন্যান্য বিশ্ববিখ্যাত পর্বতশৃঙ্গের প্রবেশদ্বার। স্কার্দু শহরটি সিন্ধু নদীর তীরে অবস্থিত এবং চারপাশে বিশাল পর্বতমালা দ্বারা পরিবেষ্টিত।
দেওসাই ন্যাশনাল পার্ক স্কার্দুর সবচেয়ে বিখ্যাত আকর্ষণগুলোর মধ্যে একটি। এটি পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মালভূমি এবং “ভূমি অফ জায়ান্টস” নামে পরিচিত। প্রায় ৪,০০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই মালভূমি গ্রীষ্মকালে বন্যফুলে ভরে যায় এবং এখানে বিপন্নপ্রায় হিমালয়ান বাদামী ভাল্লুক দেখতে পাওয়া যায়। শেওসার লেক দেওসাইয়ের মধ্যে একটি অসাধারণ সুন্দর হ্রদ যেখানে ক্যাম্পিং করা যায় এবং রাতের আকাশে তারা দেখা এক অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা।

শাংরি-লা রিসোর্ট স্কার্দুর একটি বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র যা ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। রিসোর্টটি তার অনন্য রেস্তোরাঁর জন্য বিখ্যাত যা একটি বিধ্বস্ত বিমানের ফিউজলেজের ভিতরে নির্মিত। আপার এবং লোয়ার কাচুরা লেক স্কার্দুর দুটি মনোমুগ্ধকর হ্রদ যাদের স্ফটিক স্বচ্ছ জল এবং চারপাশের ফলের গাছ অসাধারণ।
বাশো ভ্যালি স্কার্দু থেকে একটু দূরে অবস্থিত একটি মনোরম উপত্যকা যা তার সবুজ তৃণভূমির জন্য বিখ্যাত। চুন্ডা ভ্যালি আরেকটি লুকানো রত্ন যা বসন্তকালে গোলাপি এবং সাদা ফুলে ভরে যায়। স্কার্দু বাজার স্থানীয় হস্তশিল্প, রত্নপাথর এবং গহনা কেনাকাটার জন্য বিখ্যাত, বিশেষত অ্যাকোয়ামেরিন, গার্নেট এবং মাউন্টেন জেড।
ফেয়ারি মিডোজ (Fairy Meadows)
ফেয়ারি মিডোজ পাকিস্তানের অন্যতম সুন্দর এবং রোমাঞ্চকর গন্তব্য। গিলগিট-বালতিস্তান অঞ্চলের দিয়ামির জেলায় অবস্থিত এই তৃণভূমি বিশ্বের নবম উচ্চতম পর্বত নাঙ্গা পারবাত (৮,১২৬ মিটার) এর পাদদেশে অবস্থিত। প্রায় ৩,৩০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই স্থানটি পর্বতারোহীদের নাঙ্গা পারবাত আরোহণের বেস ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এই স্থানের নাম “ফেয়ারি মিডোজ” রাখেন অস্ট্রিয়ান পর্বতারোহী হারম্যান বুহল ১৯৫৩ সালে। তিনি নাঙ্গা পারবাত শৃঙ্গে আরোহণকারী প্রথম ব্যক্তি এবং এই স্থানের অতুলনীয় সৌন্দর্য দেখে তিনি মনে করেছিলেন যে এখানে পরীরা বাস করে। স্থানীয়ভাবে এই স্থানটি “জুট” নামে পরিচিত।

ফেয়ারি মিডোজে পৌঁছানো নিজেই একটি দুঃসাহসিক অভিযান। কারাকোরাম হাইওয়ের রাইকোট ব্রিজ থেকে যাত্রা শুরু হয়। এখান থেকে স্থানীয় জিপে করে ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তাতু গ্রামে পৌঁছাতে হয়। এই রাস্তাটি ২০১৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা “পৃথিবীর দ্বিতীয় সবচেয়ে বিপজ্জনক রাস্তা” হিসেবে ঘোষণা করেছে। একপাশে পাহাড়ের পাথুরে দেয়াল এবং অন্যপাশে হাজার ফুট খাদ।
তাতু গ্রাম থেকে ফেয়ারি মিডোজ পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে যেতে হয়। এই ট্রেকিং সাধারণত ৩-৪ ঘণ্টা সময় নেয়। পথে নাঙ্গা পারবাতের প্রথম দর্শন পাওয়া যায় যা এক অবিশ্বাস্য মুহূর্ত। ফেয়ারি মিডোজ পৌঁছালে চোখের সামনে ধরা দেয় এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য – সবুজ তৃণভূমি, চারপাশে পাইন ও বার্চ বন, এবং সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল নাঙ্গা পারবাত তার বরফাবৃত মুকুট নিয়ে।
ফেয়ারি মিডোজে ক্যাম্পিং এবং কাঠের কটেজে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। পূর্ণিমা রাতে যখন চাঁদের আলো নাঙ্গা পারবাতের বরফে প্রতিফলিত হয়, তখন এক জাদুকরী পরিবেশ সৃষ্টি হয়। নাঙ্গা পারবাত বেস ক্যাম্প ফেয়ারি মিডোজ থেকে একটি পূর্ণ দিনের ট্রেক যা গ্লেসিয়ার পার করে পৌঁছাতে হয়।
আরও: বিশ্বের সেরা ১০ ভ্রমণ গন্তব্য
স্বাত উপত্যকা (Swat Valley)
স্বাত উপত্যকা খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে অবস্থিত একটি অসাধারণ সুন্দর উপত্যকা যা “পাকিস্তানের সুইজারল্যান্ড” নামে পরিচিত। ব্রিটিশ রানী এলিজাবেথ দ্বিতীয় ১৯৬১ সালে এই উপত্যকা ভ্রমণ করে এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং এটিকে “পূর্বের সুইজারল্যান্ড” আখ্যা দেন। হিন্দুকুশ পর্বতমালার কোলে অবস্থিত এই উপত্যকা তার সবুজ পাহাড়, স্ফটিক স্বচ্ছ নদী, ঝর্ণা এবং সমৃদ্ধ ইতিহাসের জন্য বিখ্যাত।
কালাম স্বাত উপত্যকার সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। মিঙ্গোরা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এই শহরটি ২,০০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। কালামের প্রধান আকর্ষণ হলো এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য – চারপাশে সবুজ পাহাড়, পাইন বন এবং মাঝখানে বয়ে চলা স্বাত নদী। কান্দোল লেক কালাম থেকে একটি জনপ্রিয় ট্রেকিং গন্তব্য এবং মাহুডান্ড লেক আরেকটি সুন্দর হ্রদ যার চারপাশে তুষারাবৃত পর্বত এবং সবুজ তৃণভূমি।

মালাম জাব্বা পাকিস্তানের একমাত্র স্কি রিসোর্ট এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম। ২,৮০৪ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই পাহাড়ি রিসোর্ট শীতকালে স্কিইং এর জন্য এবং গ্রীষ্মকালে হাইকিং এর জন্য জনপ্রিয়। এখানে চেয়ার লিফট সুবিধা রয়েছে যা থেকে পুরো উপত্যকার অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়।
বুদ্ধ খোদাই স্বাতের প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী। জাহানাবাদের কাছে পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা বিশাল বুদ্ধ মূর্তি রয়েছে যা খ্রিস্টীয় ৭ম শতাব্দীর। স্বাত যাদুঘর মিঙ্গোরায় অবস্থিত এবং এখানে গান্ধার যুগের অসংখ্য মূর্তি, মুদ্রা এবং শিল্পকর্ম সংরক্ষিত আছে। বাহরাইন একটি ছোট শহর যা স্বাত নদীর তীরে অবস্থিত এবং এখানে দারাল এবং স্বাত নদীর সঙ্গম হয়েছে।
স্বাত উপত্যকা তার হস্তশিল্পের জন্যও বিখ্যাত। এখানকার শালী সূচিকর্ম, কাঠের খোদাই কাজ এবং রত্নপাথর বিশ্ববিখ্যাত। স্থানীয় বাজারে এমেরাল্ড এবং পেরিডট পাথর পাওয়া যায়।
লাহোর (Lahore)
লাহোর পাকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এবং পাঞ্জাব প্রদেশের রাজধানী। এটি পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক, শিক্ষা এবং শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। প্রায় ২০০০ বছরের পুরোনো এই শহরটি মুঘল সাম্রাজ্যের একসময়ের রাজধানী ছিল এবং এখানে মুঘল স্থাপত্যের অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে।
বাদশাহী মসজিদ লাহোরের সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপনা এবং বিশ্বের বৃহত্তম মসজিদগুলোর একটি। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব ১৬৭১ সালে এই মসজিদ নির্মাণ করেন। এর প্রধান প্রার্থনা হল একসাথে ১০০,০০০ মানুষের নামাজ পড়ার ক্ষমতা রাখে। মসজিদের চারটি মিনার প্রতিটি ৬২ মিটার উঁচু এবং লাল বেলেপাথরে নির্মিত। মসজিদের সামনের বিশাল চত্বর এবং তিনটি সাদা মার্বেলের গম্বুজ অসাধারণ স্থাপত্যকলার নিদর্শন। সন্ধ্যায় মসজিদ আলোকসজ্জায় সজ্জিত হয় যা এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের সৃষ্টি করে।

লাহোর ফোর্ট বা শাহী কিল্লা বাদশাহী মসজিদের ঠিক সামনে অবস্থিত এবং ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত। এই দুর্গের ইতিহাস ১১ শতক থেকে শুরু হলেও বর্তমান কাঠামো মুঘল সম্রাট আকবর এবং তার উত্তরসূরিরা নির্মাণ করেন। দুর্গের মধ্যে শীশ মহল বা আয়না প্রাসাদ সবচেয়ে বিখ্যাত। এর দেয়াল এবং ছাদ লাখো ছোট আয়নার টুকরো দিয়ে সাজানো যা মোমবাতির আলোতে ঝকঝক করে। দেওয়ান-ই-খাস এবং দেওয়ান-ই-আম হলগুলোতে সূক্ষ্ম মার্বেল কাজ এবং ফ্রেস্কো পেইন্টিং রয়েছে। নৌলাখা প্যাভিলিয়ন সাদা মার্বেলে নির্মিত এবং এর নামকরণ হয়েছে কারণ এটি নির্মাণে নয় লাখ রুপি খরচ হয়েছিল।
শালিমার বাগান মুঘল সম্রাট শাহজাহান ১৬৪১ সালে নির্মাণ করেন এবং এটিও ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। এই বাগানটি তিনটি স্তরে বিভক্ত – উপরের স্তর ছিল রাজকীয় পরিবারের জন্য, মধ্য স্তর সম্রাটের জন্য এবং নিচের স্তর জনসাধারণের জন্য। বাগানে ৪১০টি ঝর্ণা রয়েছে যা এক জটিল হাইড্রলিক সিস্টেমের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। রাতে ঝর্ণাগুলো রঙিন আলোয় আলোকিত করা হয় যা এক স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি করে।
জাহাঙ্গীরের সমাধি লাহোরের উপকণ্ঠে শাহদারায় অবস্থিত। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের এই সমাধিটি তার পুত্র শাহজাহান নির্মাণ করেন। লাল বেলেপাথর এবং সাদা মার্বেলে নির্মিত এই সমাধি চারটি মিনার দ্বারা পরিবেষ্টিত। সমাধির ভিতরের দেয়ালে সূক্ষ্ম ফ্রেস্কো এবং পিয়েত্রা ডুরা কাজ রয়েছে। চারপাশের বাগান মুঘল চারবাগ শৈলীতে নির্মিত।
মিনার-ই-পাকিস্তান বা পাকিস্তান রেজুলেশন স্মৃতিস্তম্ভ ইকবাল পার্কে অবস্থিত যেখানে ১৯৪০ সালে পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। ৬২ মিটার উঁচু এই মিনারটি ১৯৬৮ সালে নির্মিত হয় এবং এর ভিত্তি তারকা আকৃতির। মিনারের শীর্ষে একটি পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্ম রয়েছে যেখান থেকে পুরো লাহোর শহরের দৃশ্য দেখা যায়। রাতে মিনারটি রঙিন আলোয় আলোকিত হয়।
ওয়াগাহ বর্ডার লাহোর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে পাকিস্তান-ভারত সীমান্তে অবস্থিত। প্রতিদিন সন্ধ্যায় এখানে একটি পতাকা নামানোর অনুষ্ঠান হয় যা উভয় দেশের সীমান্ত রক্ষীরা পরিচালনা করে। এই অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ এবং হাজার হাজার দর্শক উভয় পক্ষ থেকে এসে এটি উপভোগ করেন। সৈনিকদের সিঙ্ক্রোনাইজড মার্চিং, উচ্চ কিক এবং আগ্রাসী ভঙ্গি এক অনন্য দৃশ্য।
আনারকলি বাজার লাহোরের সবচেয়ে পুরোনো এবং ব্যস্ততম বাজার। মুঘল সম্রাট আকবরের আমল থেকে এই বাজারের অস্তিত্ব রয়েছে। এখানে ঐতিহ্যবাহী পাকিস্তানি পোশাক, গহনা, জুতা এবং হস্তশিল্প পাওয়া যায়। বাজারের নামকরণ হয়েছে আনারকলি নামে একজন দাসী থেকে যার প্রেমে পড়েছিলেন যুবরাজ সেলিম (পরবর্তীতে সম্রাট জাহাঙ্গীর)।
ফুড স্ট্রিট লাহোর ফোর্টের কাছে গাওয়ালমান্ডিতে অবস্থিত এবং লাহোরি খাবারের স্বর্গ। এখানে ঐতিহ্যবাহী লাহোরি খাবার যেমন পায়া, নেহারি, হালিম, তন্দুরি চিকেন এবং সিরি পায়া পাওয়া যায়। রাতে পুরো রাস্তা আলোকসজ্জায় সজ্জিত হয় এবং লাইভ মিউজিক বাজে। কুকা’স লাহোরি মুর্গ চনা এবং কক্স অ্যান্ড কিংস এর চিকেন কারাহি বিশেষভাবে জনপ্রিয়।
লাহোর মিউজিয়াম দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম জাদুঘরগুলোর একটি এবং ১৮৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে সিন্ধু সভ্যতা, গান্ধার শিল্প, মুঘল চিত্রকলা এবং অস্ত্রশস্ত্রের বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। জাদুঘরের মূল আকর্ষণ হলো উপবাসী বুদ্ধের মূর্তি যা গান্ধার যুগের সবচেয়ে সুন্দর ভাস্কর্যগুলোর একটি। রুডইয়ার্ড কিপলিং এর বাবা জন লকউড কিপলিং এই জাদুঘরের প্রথম কিউরেটর ছিলেন।
আরও: ঢাকার সেরা ১০টি দর্শনীয় স্থান
করাচি (Karachi)
করাচি পাকিস্তানের বৃহত্তম শহর এবং সিন্ধু প্রদেশের রাজধানী। আরব সাগরের তীরে অবস্থিত এই শহরটি পাকিস্তানের অর্থনৈতিক কেন্দ্র এবং প্রধান সমুদ্রবন্দর। প্রায় ১৬ মিলিয়ন জনসংখ্যার এই মেগাসিটি বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং আধুনিকতার প্রতীক। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক স্থাপত্য থেকে শুরু করে আধুনিক আকাশচুম্বী ভবন, সবকিছুই এখানে রয়েছে।
ক্লিফটন বিচ করাচির সবচেয়ে জনপ্রিয় সমুদ্র সৈকত এবং স্থানীয়দের প্রিয় বিনোদন কেন্দ্র। বিশেষত সন্ধ্যায় হাজার হাজার মানুষ এখানে আসেন। সমুদ্র সৈকতে উটের পিঠে চড়া, ঘোড়ায় চড়া এবং বিভিন্ন খাবারের স্টল রয়েছে। কর্নিশে বা সী ভিউ এলাকা সমুদ্রের পাশে একটি সুন্দর প্রমনেড যেখান থেকে সূর্যাস্ত দেখা যায়। চায়না ক্রিক মোহনা এলাকা ম্যানগ্রোভ বনে ঘেরা এবং ডলফিন দেখার জন্য বিখ্যাত।

মাজার-ই-কায়েদ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সমাধি। সাদা মার্বেল এবং মসাইকে নির্মিত এই সমাধিটি ১৯৭০ সালে সম্পন্ন হয়। সমাধির গম্বুজ তামার তৈরি এবং রাতে আলোকসজ্জায় সজ্জিত হয়। সমাধির ভিতরে জিন্নাহর মার্বেল সারকোফেগাস রয়েছে এবং চারপাশে সবসময় সম্মানরক্ষী দাঁড়িয়ে থাকেন। প্রতি ঘণ্টায় গার্ড চেঞ্জিং অনুষ্ঠান হয় যা দেখার মতো।
ফ্রেয়ার হল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগের একটি সুন্দর ভবন যা ১৮৬৫ সালে নির্মিত হয়। ভেনিশিয়ান গথিক স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত এই ভবনটি এখন করাচি লাইব্রেরি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সন্ধ্যায় ভবনটি আলোকসজ্জায় সজ্জিত হয় এবং অসাধারণ দেখায়। মোহাট্টা প্যালেস আরেকটি ঐতিহ্যবাহী ভবন যা ১৯২০ এর দশকে একজন হিন্দু ব্যবসায়ী নির্মাণ করেন। এখন এটি একটি জাদুঘর এবং আর্ট গ্যালারি।
পাকিস্তান মেরিটাইম মিউজিয়াম করাচি বন্দরের কাছে অবস্থিত এবং পাকিস্তান নৌবাহিনীর ইতিহাস প্রদর্শন করে। এখানে সাবমেরিন PNS Hangor প্রদর্শিত আছে যা ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজ ডুবিয়েছিল। দর্শকরা সাবমেরিনের ভিতরে প্রবেশ করতে পারেন এবং একটি সাবমেরিনার কীভাবে জীবনযাপন করে তা অনুভব করতে পারেন।
ম্যানোরা দ্বীপ করাচি বন্দরের মুখে অবস্থিত একটি ছোট দ্বীপ যেখানে একটি ঐতিহাসিক বাতিঘর রয়েছে। ১৮৮৯ সালে নির্মিত এই বাতিঘরটি এখনও কার্যকর। দ্বীপে সুন্দর সৈকত এবং মাছ ধরার গ্রাম রয়েছে। ফেরি দিয়ে দ্বীপে যাওয়া যায় যা একটি আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা।
বার্নস গার্ডেন করাচির একটি ঐতিহ্যবাহী উদ্যান যা ১৮৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি করাচি চিড়িয়াখানার সাথে সংযুক্ত এবং একটি জনপ্রিয় পিকনিক স্পট। এম্প্রেস মার্কেট ব্রিটিশ আমলের একটি ঐতিহ্যবাহী বাজার যেখানে সব ধরনের জিনিস পাওয়া যায় – মশলা, কাপড়, ফল এবং পশুপাখি।
বার্নস রোড বা জিন্নাহ রোড করাচির খাবারের স্বর্গ। এখানে নিহারি, হালিম, বিরিয়ানি এবং কারাহির জন্য বিখ্যাত রেস্তোরাঁ রয়েছে। দেল ফ্রাজিওস, কাফে ফাইরোজ এবং কোলাচি সোডা ওয়াটার করাচির ঐতিহ্যবাহী খাবারের দোকান। করাচি বিরিয়ানি পাকিস্তানের সেরা বিরিয়ানি হিসেবে বিবেচিত এবং স্টুডেন্ট বিরিয়ানি এর জন্য সবচেয়ে বিখ্যাত।
ইসলামাবাদ (Islamabad)
ইসলামাবাদ পাকিস্তানের রাজধানী এবং বিশ্বের অন্যতম সুপরিকল্পিত শহর। ১৯৬০ এর দশকে গ্রীক স্থপতি কন্সট্যান্টিনোস ডক্সিয়াডিস এই শহরের পরিকল্পনা করেন। মার্গাল্লা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই শহর তার সবুজ পরিবেশ, প্রশস্ত রাস্তা এবং পরিচ্ছন্নতার জন্য বিখ্যাত। পাকিস্তানের অন্যান্য শহরের তুলনায় ইসলামাবাদ অনেক শান্ত এবং সুশৃঙ্খল।
ফয়সাল মসজিদ ইসলামাবাদের প্রধান ল্যান্ডমার্ক এবং দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম মসজিদ। তুরস্কের স্থপতি ভেদাত ডালোকে এই মসজিদের নকশা করেন এবং সৌদি বাদশাহ ফয়সাল এর অর্থায়নে ১৯৮৬ সালে নির্মাণ সম্পন্ন হয়। মসজিদের নকশা একটি বেদুইন তাঁবুর মতো এবং এর চারটি ৯০ মিটার উঁচু মিনার রয়েছে। প্রধান প্রার্থনা হল এক লাখ মানুষ ধারণ করতে পারে। মসজিদটি মার্গাল্লা পাহাড়ের পটভূমিতে অত্যন্ত সুন্দর দেখায় এবং রাতে আলোকসজ্জায় সজ্জিত হয়।

দামন-ই-কোহ একটি পর্যবেক্ষণ পয়েন্ট যা মার্গাল্লা পাহাড়ে অবস্থিত। এখান থেকে পুরো ইসলামাবাদ শহরের প্যানোরামিক দৃশ্য দেখা যায়। সন্ধ্যায় যখন শহরে আলো জ্বলে তখন দৃশ্যটি অসাধারণ হয়ে ওঠে। দামন-ই-কোহে একটি রেস্তোরাঁ এবং একটি ছোট চিড়িয়াখানা রয়েছে যেখানে মার্কোর (পাকিস্তানের জাতীয় পশু) দেখা যায়।
মার্গাল্লা হিলস ন্যাশনাল পার্ক ইসলামাবাদের উত্তরে অবস্থিত এবং ট্রেকিং ও হাইকিংয়ের জন্য বিখ্যাত। পার্কে বিভিন্ন ট্রেইল রয়েছে যার মধ্যে Trail 3 এবং Trail 5 সবচেয়ে জনপ্রিয়। প্রাকৃতিক ঝর্ণা, পাহাড়ি ছাগল এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এখানে দেখা যায়। মনি আজিজ রোড একটি সুন্দর ড্রাইভ যা পাহাড়ের মধ্য দিয়ে যায় এবং পিকনিক স্পট রয়েছে।
পাকিস্তান মনুমেন্ট পাকিস্তানের চারটি প্রদেশ এবং তিনটি অঞ্চলের প্রতীক হিসেবে ২০০৭ সালে নির্মিত হয়। সাতটি পাপড়ির মতো কাঠামো রয়েছে যা একটি ফুলের মতো দেখায়। মনুমেন্টের ভিতরে একটি জাদুঘর রয়েছে যেখানে পাকিস্তান আন্দোলনের ইতিহাস প্রদর্শিত হয়। মনুমেন্টের ছাদ থেকে শকরপাড়িয়ান পাহাড়ের দ# পাকিস্তানের সেরা ১০টি দর্শনীয় স্থান – বিস্তারিত বিবরণ
পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার একটি অসাধারণ সুন্দর দেশ, যেখানে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বতমালা, প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ, সবুজ উপত্যকা এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। হিমালয়, কারাকোরাম এবং হিন্দুকুশ পর্বতমালার মিলনস্থল এই দেশটি প্রকৃতি প্রেমী এবং রোমাঞ্চ পিপাসুদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য। প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতা থেকে শুরু করে মুঘল স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন, সব মিলিয়ে পাকিস্তান বিশ্ব ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক অনন্য গন্তব্য হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের মধ্যে পাকিস্তান ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এবং বিশ্বের সেরা উদীয়মান পর্যটন গন্তব্যগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে।
আরও: বাংলাদেশের সেরা ৫০ টি দর্শনীয় স্থান বা পর্যটন কেন্দ্র
মোহেঞ্জোদাড়ো (Mohenjo-Daro)
মোহেঞ্জোদাড়ো সিন্ধু প্রদেশের লারকানা জেলায় অবস্থিত বিশ্বের প্রাচীনতম নগর সভ্যতার একটি। প্রায় ৪,৫০০ বছর পূর্বে (খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০) নির্মিত এই শহরটি সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল। ১৯২২ সালে ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এই স্থান আবিষ্কার করেন এবং ১৯৮০ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত করে। মোহেঞ্জোদাড়ো নামের অর্থ “মৃতদের ঢিবি” যা সিন্ধি ভাষা থেকে এসেছে।
এই প্রাচীন শহরটি অসাধারণ নগর পরিকল্পনার উদাহরণ। শহরটি দুটি প্রধান অংশে বিভক্ত ছিল – উচ্চ শহর (সিটাডেল) এবং নিম্ন শহর (লোয়ার টাউন)। রাস্তাগুলো গ্রিড প্যাটার্নে সাজানো ছিল যা আধুনিক শহর পরিকল্পনার সাথে তুলনীয়। প্রধান রাস্তা প্রায় ১০ মিটার চওড়া এবং ছোট গলি ৩ মিটার চওড়া ছিল। শহরের অবকাঠামোয় উন্নত নিকাশি ব্যবস্থা ছিল – প্রতিটি ঘরে নিজস্ব বাথরুম এবং শৌচাগার ছিল যা প্রধান নিকাশি নালার সাথে সংযুক্ত ছিল।

গ্রেট বাথ মোহেঞ্জোদাড়োর সবচেয়ে বিখ্যাত কাঠামো। এটি ১২ মিটার দীর্ঘ, ৭ মিটার চওড়া এবং প্রায় ২.৪ মিটার গভীর। বাথের চারপাশে স্তম্ভযুক্ত করিডোর এবং পরিবর্তনকক্ষ ছিল। মেঝে এবং দেয়াল পোড়া ইটে নির্মিত এবং আলকাতরা দিয়ে জলরোধী করা ছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এটি ধর্মীয় স্নানের জন্য ব্যবহৃত হতো। বাথের পানি সরবরাহ এবং নিকাশি ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত ছিল।
গ্রানারি বা শস্যাগার একটি বিশাল কাঠামো যা খাদ্যশস্য সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতো। এটি প্রায় ৪৫ মিটার দীর্ঘ এবং ২৭ মিটার চওড়া। মেঝে কাঠের তৈরি ছিল এবং নিচে বায়ু চলাচলের জন্য ব্যবস্থা ছিল যাতে শস্য শুষ্ক থাকে। এই কাঠামোটি শহরের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রমাণ।
সভা হল বা অ্যাসেম্বলি হল একটি বড় কক্ষ যা সম্ভবত প্রশাসনিক বা ধর্মীয় সমাবেশের জন্য ব্যবহৃত হতো। এর মেঝে চারটি সারিতে বিভক্ত ছিল এবং স্তম্ভ দ্বারা সমর্থিত ছিল। এর স্থাপত্য শৈলী অত্যন্ত পরিশীলিত এবং প্রতিসম।
আবাসিক এলাকাগুলোতে বিভিন্ন আকারের বাড়ি ছিল যা সামাজিক শ্রেণিবিভাগের ইঙ্গিত দেয়। বেশিরভাগ বাড়ি পোড়া ইটে নির্মিত এবং একটি কেন্দ্রীয় আঙিনার চারপাশে কক্ষ সাজানো ছিল। কিছু বাড়িতে দুই তলা ছিল এবং সিঁড়ি পাওয়া গেছে। বড় বাড়িগুলোতে একাধিক আঙিনা, কূপ এবং ব্যক্তিগত বাথরুম ছিল।
কূপ ব্যবস্থা মোহেঞ্জোদাড়োর প্রকৌশল দক্ষতার আরেকটি প্রমাণ। শহরে প্রায় ৭০০ কূপ পাওয়া গেছে যা পোড়া ইটে নির্মিত এবং অনেক গভীর। এই কূপগুলো শহরের পানি সরবরাহের প্রধান উৎস ছিল।
মোহেঞ্জোদাড়োতে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো অত্যন্ত মূল্যবান। নৃত্যরত বালিকার ব্রোঞ্জ মূর্তি সবচেয়ে বিখ্যাত – মাত্র ১০.৫ সেমি উচ্চতার এই মূর্তিটি অসাধারণ শিল্পকলার নিদর্শন। পুরোহিত রাজার পাথরের মূর্তি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার – ত্রিপাতার নকশার পোশাক পরিহিত একজন দাড়িওয়ালা পুরুষের মূর্তি। সিলমোহরগুলো অত্যন্ত কারুকার্যময় – বেশিরভাগ সিলে এক শিংওয়ালা ষাঁড় (ইউনিকর্ন) খোদাই করা এবং সিন্ধু লিপিতে লেখা রয়েছে যা এখনও পাঠোদ্ধার করা যায়নি।
মৃৎপাত্র এবং টেরাকোটার খেলনা প্রচুর পরিমাণে পাওয়া গেছে। পুঁতি, গয়না, তামার যন্ত্রপাতি এবং অস্ত্র পাওয়া গেছে। পাথরের ওজন এবং পরিমাপক যন্ত্র পাওয়া গেছে যা প্রমাণ করে তাদের উন্নত ব্যবসায়িক ব্যবস্থা ছিল। এমনকি বোর্ড গেমসও পাওয়া গেছে যা বিনোদনের প্রমাণ।
মোহেঞ্জোদাড়োর পতনের কারণ এখনও রহস্যময়। কিছু তত্ত্ব বলে সিন্ধু নদীর গতিপথ পরিবর্তন, বন্যা, জলবায়ু পরিবর্তন বা বহিরাগত আক্রমণ এর কারণ হতে পারে। খ্রিস্টপূর্ব ১৯০০ সালের দিকে শহরটি পরিত্যক্ত হয়।
বর্তমানে মোহেঞ্জোদাড়ো সংরক্ষণের জন্য চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। লবণাক্ততা, ভূগর্ভস্থ পানির উত্থান এবং আবহাওয়ার প্রভাবে ইটগুলো ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। ইউনেস্কো এবং পাকিস্তান সরকার সংরক্ষণের জন্য কাজ করছে। সাইটে একটি জাদুঘর রয়েছে যেখানে আবিষ্কৃত নিদর্শন প্রদর্শিত হয়।
নারান-কাগান উপত্যকা (Naran-Kaghan Valley)
নারান এবং কাগান উপত্যকা খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের মানসেহরা জেলায় অবস্থিত দুটি অপরূপ সুন্দর পাহাড়ি উপত্যকা। কুনহার নদীর পাশে অবস্থিত এই উপত্যকাগুলো তাদের পান্না সবুজ তৃণভূমি, স্ফটিক স্বচ্ছ হ্রদ এবং তুষারাবৃত পর্বতশৃঙ্গের জন্য বিখ্যাত। গ্রীষ্মকালে যখন সারা পাকিস্তান গরমে হাঁসফাঁস করে, তখন নারান-কাগান উপত্যকা একটি শীতল আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে।
কাগান শহর উপত্যকার প্রবেশদ্বার এবং প্রথম প্রধান শহর। বালাকোট থেকে শুরু করে সড়কটি কুনহার নদীর পাশাপাশি চলে গেছে। পথে জারেদ, পাহারী এবং কাগান শহরগুলো পড়ে যেখানে হোটেল এবং রেস্তোরাঁ রয়েছে। কাগানের প্রধান বাজার স্থানীয় হস্তশিল্প এবং উলের কাপড়ের জন্য বিখ্যাত।

শোগরান কাগান উপত্যকা থেকে একটি পার্শ্ব রুট যা ২,৩৬২ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এটি একটি মনোরম তৃণভূমি যেখান থেকে মাকরা পর্বতের দৃশ্য দেখা যায়। শোগরানে কাঠের কটেজ এবং ক্যাম্পিং সাইট রয়েছে। সিরি পায়ে ঝর্ণা শোগরানের কাছে একটি সুন্দর জলপ্রপাত যা ঘন পাইন বনের মধ্যে অবস্থিত।
নারান শহর উপত্যকার সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র এবং ২,৪০৯ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এটি সায়েফ-উল-মুলুক লেকের প্রবেশদ্বার এবং অসংখ্য হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং দোকান রয়েছে। নারানের বাজার সন্ধ্যায় জীবন্ত হয়ে ওঠে এবং স্থানীয় সংগীতশিল্পীরা পারফর্ম করে। লালাজার ন্যাশনাল পার্ক নারানের কাছে অবস্থিত এবং বিপন্নপ্রায় বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল।
সায়েফ-উল-মুলুক লেক নারান-কাগান উপত্যকার মুকুটমণি এবং পাকিস্তানের সবচেয়ে সুন্দর হ্রদগুলোর একটি। ৩,২২৪ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই হ্রদ একটি হিমবাহ দ্বারা সৃষ্ট। হ্রদের পানি এমেরাল্ড সবুজ এবং অত্যন্ত স্বচ্ছ। মালিকা পারবাত পর্বতশৃঙ্গ হ্রদের পানিতে প্রতিফলিত হয় যা এক মন্ত্রমুগ্ধকর দৃশ্য। হ্রদটি একটি ফার্সি প্রেম কাহিনীর সাথে জড়িত – যুবরাজ সায়েফ-উল-মুলুক এবং পরী বাদি-উল-জামালের প্রেমকাহিনী। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুসারে পূর্ণিমা রাতে পরীরা এই হ্রদে স্নান করতে আসে।
নারান থেকে জীপে করে বা পায়ে হেঁটে সায়েফ-উল-মুলুক লেকে পৌঁছানো যায়। জীপ ভাড়া প্রায় ৮ কিলোমিটার সড়ক পাড়ি দেয় এবং এক ঘণ্টা সময় নেয়। পায়ে হাঁটলে ৪-৫ ঘণ্টা লাগে তবে পথের দৃশ্য অসাধারণ। হ্রদে নৌকা ভ্রমণ এবং ঘোড়ায় চড়ার ব্যবস্থা আছে। হ্রদের কাছে ক্যাম্পিং করা যায় তবে রাতে তাপমাত্রা শূন্যের নিচে নেমে যায়।
আনসু লেক সায়েফ-উল-মুলুক থেকে আরও উপরে ৪,২০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এটি পাকিস্তানের সর্বোচ্চ হ্রদগুলোর একটি এবং মালিকা পারবাত পর্বতের ঠিক নিচে অবস্থিত। আনসু লেক পৌঁছাতে কঠিন ট্রেকিং করতে হয় এবং এটি শুধুমাত্র অভিজ্ঞ ট্রেকারদের জন্য। হ্রদটি বেশিরভাগ সময় বরফে ঢাকা থাকে এবং জুলাই-আগস্ট মাসে কিছুটা গলে। আনসু মানে “অশ্রু” এবং স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী এই হ্রদ পরী বাদি-উল-জামালের অশ্রুতে সৃষ্ট।
বাবুসার টপ নারান-কাগান উপত্যকার শেষ পয়েন্ট এবং ৪,১৭৩ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এটি খাইবার পাখতুনখোয়া এবং গিলগিট-বালতিস্তানের মধ্যে একটি পাস। এখান থেকে ৩৬০ ডিগ্রি পর্বত দৃশ্য দেখা যায় এবং মেঘ প্রায়ই পায়ের নিচে থাকে। বাবুসার টপ শুধুমাত্র জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খোলা থাকে কারণ বাকি সময় তুষার জমে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। গিটিডাস নামক স্থানে রঙিন পাহাড় রয়েছে যা ফটোগ্রাফিক।
লুলুসার লেক বাবুসার টপের পথে ৩,৪১০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত একটি সুন্দর হ্রদ। এর পানি গভীর নীল এবং চারপাশে তুষারাবৃত পর্বত। হ্রদের কাছে একটি ছোট বাজার রয়েছে যেখানে চা এবং খাবার পাওয়া যায়। দুদিপতসার লেক আরেকটি সুন্দর হ্রদ যা লুলুসার থেকে ট্রেকিং করে পৌঁছানো যায়।
গিট্টিদাস এবং লাল পাহাড় এলাকা বাবুসার টপের কাছে অবস্থিত যেখানে পাহাড় লাল, কমলা এবং সবুজ রঙের। এটি খনিজ পদার্থের কারণে এবং অত্যন্ত ফটোজেনিক।
কুনহার নদী পুরো উপত্যকা দিয়ে প্রবাহিত এবং এর পানি দুধের মতো সাদা কারণ এটি হিমবাহ থেকে আসে। নদীর পাশে অসংখ্য পিকনিক স্পট এবং মাছ ধরার জায়গা রয়েছে। ট্রাউট মাছ এখানে প্রচুর পাওয়া যায়।
আরও: বাংলাদেশের ৬৪ জেলার দর্শনীয় স্থান
নিলাম ভ্যালি (Neelum Valley)
নিলাম ভ্যালি আজাদ কাশ্মীরে অবস্থিত একটি অপূর্ব সুন্দর উপত্যকা যা নিলাম নদীর পাশে বিস্তৃত। প্রায় ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই উপত্যকা মুজাফফরাবাদ থেকে শুরু হয়ে তাওবাট পর্যন্ত বিস্তৃত। নিলাম নামের অর্থ “নীল রত্ন” যা নদীর নীল জলের কারণে দেওয়া হয়েছে। এই উপত্যকা তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঝর্ণা, হ্রদ এবং সবুজ পাহাড়ের জন্য বিখ্যাত।
কেরান নিলাম উপত্যকার প্রথম প্রধান শহর এবং মুজাফফরাবাদ থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে। এখানে নিলাম এবং কুনহার নদীর সঙ্গম হয়েছে। কেরান একটি সুন্দর পিকনিক স্পট এবং নদীর পাশে বসে খাওয়ার জন্য রেস্তোরাঁ রয়েছে। নদীতে মাছ ধরা এবং নৌকা চালানো জনপ্রিয় কার্যক্রম।

শরদা মন্দির এবং শরদা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ নিলাম উপত্যকার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। ৬ষ্ঠ থেকে ১২শ শতাব্দী পর্যন্ত এই স্থান শিক্ষা এবং ধর্মের একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল। শরদা লিপি এখানে উদ্ভূত হয়েছিল যা পরে বিভিন্ন ভারতীয় লিপির ভিত্তি হয়েছে। পাথরের খোদাই এবং মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ এখনও দেখা যায়। শরদা গ্রাম পাকিস্তান-ভারত নিয়ন্ত্রণ রেখার খুব কাছে এবং পারমিট প্রয়োজন।
আরাং কেল নিলাম উপত্যকার সবচেমালাম জাব্বা পাকিস্তানের একমাত্র স্কি রিসোর্ট এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম। ২,৮০৪ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই পাহাড়ি রিসোর্ট শীতকালে স্কিইং এর জন্য এবং গ্রীষ্মকালে হাইকিং এর জন্য জনপ্রিয়। এখানে চেয়ার লিফট সুবিধা রয়েছে যা থেকে পুরো উপত্যকার অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়। তালেবান আমলে এই রিসোর্ট ধ্বংস করা হয়েছিল, তবে পরবর্তীতে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।
বুদ্ধ খোদাই স্বাতের প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী। জাহানাবাদের কাছে পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা বিশাল বুদ্ধ মূর্তি রয়েছে যা খ্রিস্টীয় ৭ম শতাব্দীর। এছাড়াও উদেগ্রাম এবং বারিকোটে প্রাচীন গান্ধার সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। স্বাত যাদুঘর মিঙ্গোরায় অবস্থিত এবং এখানে গান্ধার যুগের অসংখ্য মূর্তি, মুদ্রা এবং শিল্পকর্ম সংরক্ষিত আছে।
বাহরাইন একটি ছোট শহর যা স্বাত নদীর তীরে অবস্থিত। এখানে দারাল এবং স্বাত নদীর সঙ্গম হয়েছে এবং এই জায়গাটি অত্যন্ত মনোরম। পাথরের সেতু এবং চারপাশের পাহাড় এক অনন্য দৃশ্যের সৃষ্টি করে। খানপুর ঝর্ণা বাহরাইনের কাছে একটি সুন্দর জলপ্রপাত যেখানে পর্যটকরা পিকনিক করতে আসেন।
ফিজাগাট পার্ক মিঙ্গোরার কেন্দ্রে অবস্থিত একটি সুন্দর উদ্যান যেখানে স্থানীয় পরিবারগুলো বিকেলে আসে। এখান থেকে শহর এবং চারপাশের পাহাড়ের দৃশ্য উপভোগ করা যায়। মারঘজার শ্বেত প্রাসাদ স্বাতের সাবেক ওয়ালির (শাসক) প্রাসাদ যা ১৯৪০ এর দশকে নির্মিত হয়েছিল। এটি এখন একটি হোটেল এবং পর্যটকরা এখানে থাকতে পারেন।
স্বাত উপত্যকা তার হস্তশিল্পের জন্যও বিখ্যাত। এখানকার শালী সূচিকর্ম, কাঠের খোদাই কাজ এবং রত্নপাথর বিশ্ববিখ্যাত। স্থানীয় বাজারে এমেরাল্ড এবং পেরিডট পাথর পাওয়া যায়। স্বাতের খাবারের মধ্যে চপলি কাবাব, লাম্ব পুলাও এবং স্থানীয় মধু বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ফেসবুক: GoArif
