কাকরাইল মসজিদ (Kakrail Mosque), বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার রমনা পার্কের পাশেই অবস্থিত। মসজিদ টি বাইরে থেকে দেখলে হয়তো বিশেষ কিছু মনে হবে না আপনার। কিন্তু একটু ভেতরে ঢুকলে বুঝবেন, এখানে একটা আলাদা পৃথিবী আছে। দেশের গ্রামগঞ্জ থেকে আসা মানুষ, আবার পাশেই হয়তো কথা বলছেন মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা কেউ, এই মসজিদে প্রতিদিন এমনই চিত্র দেখা যায়। কাকরাইল মসজিদ শুধু একটা ইবাদতের জায়গা নয়, এটি বাংলাদেশে তাবলীগ জামাতের মারকায বা প্রধান কেন্দ্র। আর সেই হিসেবে এর গুরুত্ব অনেক বেশি।
আরও: বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ
এই মসজিদটা ঠিক কবে তৈরি হয়েছিল, কেইবা বানিয়েছিলেন সেটা নিয়ে পরিষ্কার কোনো তথ্য নেই। তবে, মসজিদের পুরনো মানুষজন বলেন, প্রায় তিনশো বছর আগে ঢাকার নবাব পরিবারের কেউ একজন এখানে একটি মসজিদ বানিয়েছিলেন। মসজিদটির গড়নও নবাবদের অন্যান্য স্থাপনার মতোই ছিল। শুরুতে ছিল একটা ছোট্ট মসজিদ, সামনে একটা পুকুর। আরেকটা মত আছে যে, চল্লিশের দশকে রমনা পার্কের মালিরা, মানে বাগানকর্মীরা, টিনের ছাউনি দিয়ে একটা ছোট নামাজঘর বানিয়েছিলেন। সেই মসজিদটির নাম ছিল মালওয়ালি মসজিদ ‘মালি’ অর্থাৎ বাগানকর্মীদের নাম থেকে।
কাকরাইল মসজিদ যে নামেই পরিচিত হোক, এটা সেই পুরনো ইতিহাসটা এখনো বহন করে চলেছে। ১৯৪৬ সালে মাওলানা আব্দুল আজিজ সাহেব কলকাতা থেকে বাংলাদেশে তাবলীগের কাজ নিয়ে আসেন। প্রথমে পুরান ঢাকার লালবাগ কেল্লার কাছে ‘খান মুহাম্মদ মসজিদে’ এই কার্যক্রম চলত। তারপর ১৯৫২ সালে কাকরাইল মসজিদকে বাংলাদেশের তাবলীগ জামাতের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত, প্রতিদিন সকাল থেকে রাত নামাজ, বয়ান, জিকির, তেলোয়াত থামেনি এখানে। ১৯৬০-এর দশকে মসজিদটি বড় আকারে পুনর্নির্মাণ করা হয়। প্রকৌশলী মরহুম হাজী আব্দুল মুকিতের নকশায় তৈরি হয় বর্তমানের তিনতলা মসজিদ। মসজিদের ছাদ লাগোয়া ত্রিভুজ আকৃতির নকশা, চৌকোণা স্তম্ভ, ঢেউ খেলানো পশ্চিমের দেওয়াল, এগুলো দেখলেই বোঝা যায়, নকশাকার মনপ্রাণ ঢেলে কাজটা করেছিলেন।
কি কি দেখবেন
মসজিদটা দেখতে এলে শুধু মূল ভবনটা দেখলেই হবে না, পুরো জায়গাটা একটু ঘুরে দেখুন।
- মূল মসজিদ ভবন: তিনতলা মসজিদের স্থাপত্য অন্যান্য মসজিদ থেকে একটু আলাদা। ত্রিভুজাকৃতির নকশা আর ঢেউ খেলানো দেওয়াল চোখে পড়বে আলাদাভাবে। তিন দিকে প্রশস্ত বারান্দা মুসল্লিরা এখানে বসেই বয়ান শোনেন।
- অজুখানা: মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে দুটো পুকুরের মতো হাউজ আছে। একসাথে শতাধিক মানুষ অজু করতে পারেন। এই দৃশ্যটা একটু অন্যরকম, খুব সাধারণ কিন্তু কোথাও একটা মনে দাগ রেখে যায়।
- ছয়তলা ভবন: মসজিদের ডান পাশে একটি ছয়তলা ভবন আছে। এখানে হিফজখানা, ছাত্রাবাস এবং তাবলীগের দপ্তর। পুরো কমপ্লেক্সটা আসলে একটা ছোট্ট ইসলামিক শিক্ষাকেন্দ্রের মতো।
- আন্তর্জাতিক মানুষজন: এটা আলাদাভাবে উল্লেখ করার কারণ আছে। আরব, মালয়, ইন্দোনেশিয়ান, পাকিস্তানি — নানা দেশের মানুষ প্রায় সবসময়ই এখানে থাকেন। এই বৈচিত্র্য নিজেই একটা দেখার বিষয়।
- রমনা পার্ক (পাশেই): মসজিদ ঘুরে একটু হাঁটলেই দেখা পাবেন রমনা পার্ক। ঢাকার ব্যস্ততার মাঝে এই সবুজ জায়গাটায় কিছুক্ষণ বসলে মনটা একটু হালকা লাগে।
কিভাবে যাবেন
কাকরাইল মসজিদ ঢাকার একদম মাঝখানে তাই যোগাযোগ নিয়ে বিশেষ চিন্তা নেই। আপনি বাংলাদেশে কিংবা বিশ্বের যেকোন স্থান থেকে এখানে আসতে পারেন। প্রথমে বাংলাদেশের যেকোন স্থান থেকে গুলিস্থান চলে আসুন। গুলিস্থান থেকে রিক্সা কিংবা অটো অথবা CNG করে শাহবাগ বা মৎস্য ভবন হয়ে চলে আসুন কাকরাইল মসজিদ। আপনি শাহবাগ বা মৎস্য ভবন স্টপে নামলে, সেখান থেকে হেঁটে ৫–১০ মিনিট লাগবে। এছাড়া ঢাকার প্রায় যেকোন রুটের বাসে করেই এখানে আসতে পারবেন।
বিমানে আসলে ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রাইভেটকার, উবার, পাঠাও কিংবা CNG করে চলে আসতে পারেন। এছাড়া মেট্রোরেলে আসলে বাংলাদেশ সচিবালয় স্টেশনে নামুন, সেখান থেকে রিকশা বা সিএনজিতে ১০–১৫ মিনিট লাগবে।
আরও: আহসান মঞ্জিল
কোথায় খাবেন
মসজিদের একদম আশেপাশে কিছু সাধারণ মানের খাবারের দোকান রয়েছে। এখানে ভাত-তরকারি, পরোটা, খিচুড়ি পাবেন অল্প দামে। দূর থেকে আসা মুসল্লিরা এখানেই বেশি খেয়ে থাকেন। একটু ভালো খাবার চাইলে ৫–১০ মিনিট হাঁটলেই শাহবাগ। সেখানে নানা মানের রেস্তোরাঁ আছে। বিরিয়ানি বা কাচ্চি খেতে চাইলে মগবাজার বা বিজয়নগরের দিকে যেতে পারেন। বিশেষ সময়ে, বিশেষ করে ইজতেমার আশেপাশে, মসজিদের ভেতর থেকে খাবার বিতরণের ব্যবস্থা থাকে।
কোথায় থাকবেন
কাকরাইল ঢাকার কেন্দ্রে হওয়ায় থাকার জায়গার অভাব নেই এখানে। তাবলীগের কাজে এলে মসজিদের ছয়তলা ভবনে থাকার সুযোগ আছে, তবে সেটা দ্বীনি কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারীদের জন্য। সাধারণ ভ্রমণকারীরা কাকরাইল, বিজয়নগর বা মতিঝিল এলাকায় ৫০০–১৫০০ টাকার মধ্যে বাজেট হোটেল পাবেন। শাহবাগ বা রমনা এলাকায় ২০০০–৫০০০ টাকায় আরামদায়ক হোটেলও আছে। একটু ভালো থাকতে চাইলে গুলশান বা বনানীতে থেকে দিনে এসে ঘুরে যেতে পারেন।
টিপস ও সতর্কতা
- পোশাক পরিষ্কার ও শালীন হওয়া চাই। পুরুষদের জন্য পাঞ্জাবি স্বাভাবিক, তবে শার্ট-প্যান্টও সমস্যা নেই। মহিলারা হিজাব পরে আসুন।
- ছবি তোলার আগে একটু বুঝে নিন নামাজের সময় বা কেউ ইবাদতে ব্যস্ত থাকলে ছবি না তোলাই ভালো। ভেতরে ছবি তুলতে চাইলে আশেপাশের মানুষকে একবার জিজ্ঞেস করে নিন।
- ফজর বা মাগরিবের সময় এলে সবচেয়ে বেশি মানুষ দেখবেন, পরিবেশটাও অন্যরকম থাকে। বিকেলটা তুলনামূলক শান্ত।
- শীতকালে (অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি) আসা সবচেয়ে আরামদায়ক। গরমের সময় পানির বোতল সাথে রাখুন।
আরও: লালবাগ কেল্লা
কাকরাইল মসজিদ নিয়ে প্রশ্ন ও উত্তর
কাকরাইল মসজিদ কি সবার জন্য উন্মুক্ত?
হ্যাঁ, সব মুসলিমের জন্য মসজিদ সবসময় খোলা। অমুসলিম পর্যটকরা বাইরে থেকে দেখতে পারবেন।
মসজিদটির আসল নাম কী ছিল?
পুরনো নাম ছিল ‘মালওয়ালি মসজিদ’। রমনা পার্কের মালি বা বাগানকর্মীদের নাম থেকে এই নামটা এসেছিল। পরে এলাকার নামে সবাই কাকরাইল মসজিদ বলতে শুরু করে।
কাকরাইল মসজিদ কখন তাবলীগ জামাতের কেন্দ্র হয়?
১৯৫২ সালে। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের তাবলীগ কার্যক্রমের মূল কেন্দ্র এটিই।
বিশ্ব ইজতেমার সময় কি এখানে বিশেষ কিছু হয়?
হ্যাঁ। টঙ্গীর ইজতেমার আগে-পরে কাকরাইলে বিশেষ সমাগম হয়। দেশ-বিদেশের হাজার হাজার মুসল্লি এখানে সময় কাটান।
মসজিদের পাশে আর কী কী দেখার আছে?
একদম পাশেই রমনা পার্ক। কাছেই শাহবাগ, জাতীয় জাদুঘর, টিএসসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। একদিনে পুরো এলাকাটা ঘুরে দেখে নিতে পারবেন।
মহিলারা কি ভেতরে যেতে পারবেন?
মহিলাদের নামাজের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকে। তবে তাবলীগের কার্যক্রমের এলাকায় প্রবেশে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। তবে অবশ্যই শালীন পোশাক পড়ে আসবেন।
ফেসবুক: Kuhudak

