শেরপা কি? পর্বতারোহণ, এভারেস্ট, ইতিহাস, এবং সংস্কৃতি

এভারেস্টের চূড়ার কথা মনে এলেই একটা নাম আপনা আপনি চলে আসে, তেনজিং নোরগে। আর এই তেনজিং নোরগের পরিচয়ের সাথে জড়িয়ে আছে আরেকটা শব্দ তা হচ্ছে, শেরপা (Sherpa)। কিন্তু শেরপা আসলে কারা? এটা কি কোনো পেশার নাম? নাকি কোনো জাতির?

অনেকেই ভুল করে “শেরপা” মানে পাহাড়ের গাইড বা বোঝা বহনকারী মনে করেন। আসলে শেরপা একটি নৃগোষ্ঠীর নাম। নেপালের পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী একটি জাতির নাম।

- বিজ্ঞাপন -

আরও: আরতুগ্রুল গাজী ও উসমান সিরিজের শুটিং লোকেশন ও অজানা তথ্য

শব্দটার মানে কি

“শেরপা” শব্দটা এসেছে তিব্বতি ভাষা থেকে। “শার” মানে পূর্ব, আর “পা” মানে মানুষ। অর্থাৎ “পূর্বের মানুষ”। শেরপা ভাষার শর (“পূর্ব”) এবং ওয়াহ (“মানুষ”) শব্দ দুটো থেকেই এই নামের উৎপত্তি, যা উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় নেপালে তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।

কোথা থেকে এলেন শেরপারা

শেরপারা মূলত তিব্বতের খাম অঞ্চল থেকে এসেছেন। দ্বাদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যে তারা নেপালের সোলু-খুম্বু এলাকায় এসে বসবাস শুরু করেন। নতুন চারণভূমির খোঁজ এবং ধর্মীয় মতভেদ, মূলত এই দুটো কারণেই তারা তিব্বত ছেড়ে হিমালয় পার হয়ে নেপালে আসেন। তাদের নতুন আবাসভূমিতে উচ্চতা ছিল ৩,০০০ থেকে ৪,৩০০ মিটারের মধ্যে, এবং এই কঠিন পরিবেশে তারা ধীরে ধীরে অভিযোজিত হয়ে ওঠেন।

কোথায় থাকেন

বেশিরভাগ শেরপা নেপালের পূর্বাঞ্চলে বাস করেন। তবে কিছু শেরপা চীন, ভুটান, ভারতের সিকিম এবং পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলাতেও ছড়িয়ে আছেন। নেপালের সোলুখুম্বু জেলাই তাদের প্রধান আবাস, যেখানে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্ট দাঁড়িয়ে আছে।

শারীরিক গড়ন

শেরপাদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাদের শরীরের গড়ন, যা তাদের উচ্চতায় টিকে থাকতে এবং কাজ করতে সাহায্য করে। শেরপারা তিব্বতি মালভূমিতে প্রায় ২৫,০০০ থেকে ৪০,০০০ বছর ধরে বসবাসের ফলে বংশগতভাবেই উচ্চ উচ্চতায় টিকে থাকার জন্য বিশেষভাবে অভিযোজিত হয়েছেন। বিশেষভাবে EPAS1 জিনে একটা পরিবর্তন আছে শেরপাদের, যাকে “সুপার-অ্যাথলেট জিন”ও বলা হয়। এই জিনের কারণে তারা হালকা বায়ুতেও অক্সিজেন অনেক কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারেন। সহজ কথায়, যে উচ্চতায় একজন সাধারণ মানুষের দম বন্ধ হয়ে আসে, সেখানে শেরপারা ভারী বোঝা নিয়েও স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন!

পর্বতারোহণে শেরপাদের ভূমিকা

বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে পশ্চিমা পর্বতারোহীরা এভারেস্ট জয়ের চেষ্টা শুরু করলে তারা শেরপাদের সাহায্য নিতে শুরু করেন। খুব দ্রুত তারা বুঝতে পারেন যে শেরপাদের ছাড়া এই অভিযান সম্ভব না। শেরপারা শুধু পথই দেখান না, দড়ি বাঁধেন, ক্যাম্প স্থাপন করেন, আসবাবপত্র বহন করেন, এবং বিপদে পড়লে প্রাণ বাঁচান। এডমন্ড হিলারি থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মুসা ইব্রাহীম, হাজার হাজার পর্বতারোহীর রোমাঞ্চকর অভিযানের নেপথ্যে শেরপারাই আছেন।

আরও: কেন ম্যাকঅ্যালেন আমেরিকার সবচেয়ে সস্তা শহর

সংস্কৃতি ও ধর্ম

শেরপা সংস্কৃতি তাদের তিব্বতীয় বৌদ্ধ ঐতিহ্য দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। পাহাড়কে তারা শুধু চড়ার জায়গা মনে করেন না, দেবতার আসন মনে করেন। যাক পালন, যব চাষ আর সরল পার্বত্য জীবনযাপনই তাদের মূল ঐতিহ্য। শেরপারা আসলে শুধু গাইডই দেন না, তারা হিমালয়ের আত্মার একটা অংশ। পর্বতের যত অভিযান, তার পেছনে শেরপাদের অবদান না জানলে সেই গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যায়।


ফেসবুক: Kuhudak

শেয়ার করুন
গোআরিফ লগো আইকনগোআরিফ লগো আইকন

আপনার আশেপাশের দর্শনীয় স্থানের তথ্য দিন

আপনার আশেপাশের দর্শনীয় স্থানের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করুন।