চীনের মহাপ্রাচীর (দ্য গ্রেট ওয়াল অব চায়না)
পৃথিবীতে এমন একটা স্থাপনা আছে যেটা তৈরি হতে লেগেছে প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি সময়, আর এর মোট দৈর্ঘ্য পৃথিবীর অর্ধেক পরিধির সমান! নাম তার চীনের মহাপ্রাচীর, বা গ্রেট ওয়াল অব চায়না।
এই প্রাচীরের সব অংশ একসাথে মিলিয়ে মোট দৈর্ঘ্য প্রায় একুশ হাজার একশো ছিয়ানব্বই কিলোমিটার। ভাবা যায়, এটা পৃথিবীর নিরক্ষরেখার অর্ধেক পরিধির চেয়েও বেশি। তবে এই পুরোটাই একটা একক স্থাপনা না, বরং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজবংশের হাতে তৈরি হওয়া অসংখ্য দেয়াল মিলিয়ে এই বিশাল কাঠামো গড়ে উঠেছে।
প্রাচীরের ইতিহাস শুরু হয় আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে, খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর দিকে, যখন চীনের বিভিন্ন রাজ্য নিজেদের সীমানা রক্ষার জন্য আলাদা আলাদা দেয়াল বানাতে শুরু করে। পরে খ্রিস্টপূর্ব তিন শতাব্দীতে চিন শি হুয়াং, চীনের প্রথম সম্রাট, এই বিচ্ছিন্ন দেয়ালগুলোকে একসাথে জুড়ে একটামাত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় রূপ দেন। এরপর প্রায় নয়টা রাজবংশ শত শত বছর ধরে এই প্রাচীর মেরামত আর সম্প্রসারণের কাজ চালিয়ে গেছে।
আজকে আমরা যে প্রাচীরটা সবচেয়ে বেশি দেখি এবং যেটার কথা মাথায় আসে, সেটা মূলত মিং রাজবংশের তৈরি, যাদের শাসনকাল ছিল চৌদ্দশো আটষট্টি থেকে ষোলশো চুয়াল্লিশ সাল পর্যন্ত। এই অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় আট হাজার আটশো পঞ্চাশ কিলোমিটার, আর এটাই সবচেয়ে ভালো সংরক্ষিত অংশ। বেইজিং এর আশেপাশের বাদালিং আর মুতিয়ানইউ অংশগুলো এই মিং আমলেরই তৈরি, আর সেগুলোই এখন সবচেয়ে বেশি পর্যটক টানে।
প্রাচীর বানানোর কাজে যে শ্রমিকরা নিয়োজিত ছিলেন তাদের মধ্যে সাধারণ মানুষ, সৈনিক, বন্দি আর যুদ্ধবন্দিরাও ছিলেন। কাজটা এতটাই কঠিন আর বিপজ্জনক ছিল যে বহু মানুষ কাজ করতে করতেই মারা যান। মজার একটা তথ্য হলো, মিং আমলে দেয়ালের ইট জোড়া দিতে আঠালো ভাত বা আঠালো চালের গুঁড়া ব্যবহার করা হতো চুনের সাথে মিশিয়ে। এই মিশ্রণটা এতটাই মজবুত ছিল যে এখনো অনেক জায়গায় এই জোড়া অক্ষত আছে, এমনকি সেখানে আগাছাও জন্মায় না।
একটা প্রচলিত ধারণা আছে যে মহাপ্রাচীর নাকি চাঁদ থেকে খালি চোখে দেখা যায়, কিন্তু এটা আসলে একটা মিথ, বাস্তবে এমনটা সম্ভব না। তবে পৃথিবীর নিচু কক্ষপথ থেকে বিশেষ পরিস্থিতিতে এটা দেখা সম্ভব হয় বলে জানা যায়।
সবচেয়ে দুঃখজনক তথ্য হলো, সময়ের সাথে সাথে প্রাচীরের প্রায় এক তৃতীয়াংশ অংশ হারিয়ে গেছে, কিছুটা প্রাকৃতিক ক্ষয়ের কারণে, আবার কিছুটা মানুষের অসাবধানতার কারণেও। ১৯৫৭ সালে বাদালিং অংশ প্রথম সংস্কার করে পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়, আর ১৯৮৭ সালে ইউনেস্কো একে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
এই প্রাচীর শুধু একটা প্রতিরক্ষা কাঠামো না, এটা যেন চীনের হাজার বছরের ইতিহাস, সংগ্রাম আর দৃঢ়তার এক জীবন্ত সাক্ষী। পাহাড়ের চূড়া বেয়ে বেয়ে দূর দিগন্তে হারিয়ে যাওয়া এই দেয়াল দেখলে সত্যিই বোঝা যায় মানুষ ইচ্ছা করলে কতটা বিশাল কিছু গড়ে তুলতে পারে।
আপনাদের মধ্যে কেউ কি সরাসরি গিয়ে এই মহাপ্রাচীরের কোনো অংশ দেখে এসেছেন? দেখলে কেমন লেগেছিল একটু শেয়ার করুন।
#চীনেরমহাপ্রাচীর #গ্রেটওয়ালঅবচায়না #বিশ্বভ্রমণ #ইতিহাসেরগল্প #অজানাতথ্য #প্রাচীনসভ্যতা
