হারিকেনের আগে, ঢিবিবাতির পরে এই ছোট্ট মাটির পাত্রেই ছিল বাংলার কোটি দরিদ্র মানুষের রাতের আলো। সলতে-তেল-পাত্র মিলিয়ে তৈরি কুপিবাতি (Kupibati) এককালে প্রতিটি ঘরের অন্ধকার দূর করত।
সন্ধ্যা নামলেই ঘরের কোণে রাখা ছোট্ট মাটির পাত্রে সলতে জ্বালিয়ে দেওয়া হত। তেলে ভেজা সলতার আগায় আগুনের কাঁপতে থাকা শিখা, এটুকুই কুপিবাতি। এটার আলো সামান্য ছিল। তবে কাজের ছিল অনেক। কিন্তু সেই সামান্য আলোতেই মা রান্না করেছেন, বাবা হিসাব মিলিয়েছেন, ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
হারিকেনের চেয়েও পুরনো, হারিকেনের চেয়েও সস্তা কুপিবাতি ছিল বাংলার সবচেয়ে দরিদ্র মানুষটির আলোর ব্যবস্থা। যার হারিকেন কেনার সামর্থ্য ছিল না, তার ঘরেও কুপিবাতি জ্বলত।
আরও: একতারা
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
| বাংলা নাম | কুপিবাতি, কুপি |
| অন্য নাম | ডিবা, ডিবিবাতি, প্রদীপ |
| ইংরেজি নাম | Oil Wick Lamp |
| উপাদান | মাটি, কাচ, পিতল, টিন |
| জ্বালানি | কেরোসিন |
| সলতে | সুতি কাপড়ের টুকরো |
| আলোর পরিমাণ | ০.৫–১ মোমবাতি শক্তি |
| জ্বালানি ব্যয় | অত্যন্ত সামান্য |
সভ্যতার আদিমতম আলো
কুপিবাতি মানব সভ্যতার সবচেয়ে পুরনো কৃত্রিম আলোর উৎসের একটি। প্রায় ৭০,০০০ বছর আগের প্রাচীন গুহায় পাথরের তৈরি তেলের পাত্র পাওয়া গেছে! যেখানে পশুর চর্বিতে সলতে জ্বালানো হত। মিশরে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ সালের মাটির প্রদীপ আবিষ্কার হয়েছে। গ্রিক ও রোমান সভ্যতায় অলিভ অয়েলের প্রদীপ ছিল আলোর প্রধান মাধ্যম।
বাংলাদেশে কুপিবাতির ইতিহাস হাজার বছরের। প্রাচীন বাংলার মন্দির, মসজিদ, গৃহস্থালি – সর্বত্র প্রদীপ বা কুপি জ্বলত। পোড়ামাটির প্রদীপ তৈরি হত কুমারের চাকে।
গঠন
কুপিবাতির গঠন এত সরল যে যেকোনো মানুষ বাড়িতে বানিয়ে নিতে পারতেন। একটি ছোট পাত্র, হোক সেটি মাটির, কাচের বা পুরনো টিনের কৌটার – তাতে তেল ভরুন, সুতি কাপড়ের একটা পাকানো টুকরো সলতে হিসেবে ডুবিয়ে দিন, সলতার উপরিভাগে আগুন লাগান, কুপিবাতি তৈরি।
এই সরল কাঠামোর মধ্যে আছে পদার্থবিজ্ঞানের কৌশীয় ক্রিয়া (capillary action) – সলতে তেল শুষে নিজে থেকেই উপরে তুলে দেয়, তাই বারবার তেল ঢালতে হয় না। যতক্ষণ পাত্রে তেল থাকে, সলতে নিজেই তেল টেনে জ্বলতে থাকে।
আরও: ঢেঁকি
কুপিবাতি ও সংস্কৃতি
কুপিবাতি বাংলার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় জীবনে গভীরভাবে মিশে আছে। হিন্দু সংস্কৃতিতে “দীপ জ্বালাও” মানে কুপিবাতি বা প্রদীপ জ্বালানো, শুভ সূচনার প্রতীক। মুসলমান পরিবারে মৃত্যুর পর মাজারে প্রদীপ জ্বালানোর রীতি রয়েছে।
বাংলা লোকগানে কুপি বা প্রদীপ বারবার এসেছে প্রতীকী অর্থে – “মনের আলো জ্বালো”, “ঘরে আলো দাও মা” -এই গানগুলোয় কুপির শিখাই হয়ে উঠেছে জ্ঞান ও মুক্তির রূপক। রবীন্দ্রনাথের গানেও দীপ ও প্রদীপের উপমা বহু জায়গায় এসেছে। মাটির কুপি তৈরি করতেন কুমার সম্প্রদায়। তাঁদের চাকে তৈরি হত ছোট ছোট প্রদীপ, যা বাজারে খুব কম দামে বিক্রি হত। পূজার মৌসুমে কুমারপাড়ায় দিনরাত চাকা ঘুরত। কুপির চাহিদা কমে যাওয়ার সাথে সাথে কুমারদের এই বিশেষ পণ্যটির বাজারও সংকুচিত হয়েছে।
বর্তমান অবস্থা
আজকের বাংলাদেশে কুপিবাতি প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। তবে দুটো জায়গায় এখনো টিকে আছে। প্রথমত, ধর্মীয় ও আচার-অনুষ্ঠানে আর মন্দিরে প্রদীপ, মাজারে বাতি হিসেবে পিতলের দীপ এখনো জ্বলে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎহীন অতি প্রত্যন্ত এলাকায় জরুরি আলো হিসেবে।
Facebook: Kuhudak