নওয়াবের রাজসিক বের হওয়া থেকে পুরান ঢাকার সংকীর্ণ গলির “টমটম” ঘোড়ার গাড়ি (Horse Carriage) প্রায় দুইশো বছর ধরে এই শহরের সঙ্গী। মোটরগাড়ির ভিড়ে হারিয়ে গেলেও একেবারে মরেনি। ট্যাক ট্যাক ট্যাক, পাথরের রাস্তায় ঘোড়ার খুরের শব্দ। পেছনে দুলতে দুলতে আসছে রঙিন পর্দাঘেরা গাড়ি, সামনে বসে কোচোয়ান লাগাম ধরে। এই দৃশ্যটাই একসময় ছিল ঢাকার নিত্যদিনের ছবি। পুরান ঢাকার সরু গলি থেকে মোগলটুলির বড় রাস্তা, সবখানে টমটমের চাকা ঘুরত।
ঘোড়ার গাড়ি বাংলাদেশে গরুর গাড়ির চেয়ে আলাদা। গরুর গাড়ি যেখানে মাঠে-মেঠো পথে ফসল বহন করত, ঘোড়ার গাড়ি ছিল শহরের বাহন, অভিজাত মানুষের যান, দ্রুত যাতায়াতের মাধ্যম। নবাব থেকে ব্যবসায়ী, সাহেব থেকে ভদ্রলোক, সবার পছন্দের বাহন ছিল এই টমটম।
আরও: বায়োস্কোপ
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
| সাধারণ নাম | ঘোড়ার গাড়ি |
| ঢাকার নাম | টমটম |
| অন্য নাম | টাঙ্গা, জুড়িগাড়ি, এক্কা |
| ইংরেজি | Horse Carriage / Tonga |
| চালকের নাম | কোচোয়ান / সহিস |
| চাকার সংখ্যা | ২ বা ৪ |
| ঘোড়ার সংখ্যা | ১ বা ২টি |
নওয়াব থেকে গণমানুষের বাহন
ইতিহাসবিদদের মতে, ঢাকায় ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন শুরু হয় ১৮৩০ সালে নবাবি শাসনামলে। নবাবেরা রাজকীয় ভ্রমণে ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করতেন। আবার গবেষকদের একাংশ মনে করেন, ঢাকায় বসবাসরত আর্মেনীয়রা ১৮৫৬ সালে প্রথম এটি চালু করে।
ইংরেজ শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন শুরু হয়। ব্রিটিশদের পৃষ্ঠপোষকতায় উনিশ শতকের মাঝামাঝি কলকাতা থেকে প্রথম ঢাকার রাস্তায় ঘোড়ার গাড়ি নামানোর ব্যবস্থা করা হয়। তখন এটি “ঠিকা গাড়ি” নামে পরিচিত ছিল।
নওয়াব পরিবার ও ঘোড়ার গাড়ি: ঢাকার নওয়াব পরিবার ঘোড়ার গাড়িকে রাজকীয় পরিচয়ের অংশ বানিয়েছিলেন। সোনা-রুপার কাজ করা জুড়িগাড়িতে নওয়াব বের হলে রাস্তার দু’ধারে মানুষ দাঁড়িয়ে দেখত। আহসান মঞ্জিল থেকে শুরু করে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে নওয়াবি ঘোড়ার গাড়ির যাত্রা ছিল এক রাজকীয় দৃশ্য। পরে এই বাহন ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছায়।
গঠন ও প্রকারভেদ
গঠন বৈশিষ্ট্য ও নামের দিক থেকে ঘোড়ার গাড়ির অনেক রকমফের দেখা যায়। কোথাও দুই চাকার, আবার কোথাও চার চাকার; কখনো দু’দিকে রঙিন কাচের জানালাসহ আবৃত আসন, আবার কখনো খোলা আসনবিশিষ্ট। ঢাকায় এই গাড়ি টমটম নামে পরিচিত, অন্যত্র টাঙ্গা, জুড়িগাড়ি বা এক্কা নামেও পরিচিতি আছে।
আরও: পালকি
কোচোয়ান
কোচোয়ান বা সহিস ছিলেন ঘোড়ার গাড়ির প্রাণ। তিনি শুধু গাড়ি চালাতেন না, ঘোড়ার দেখভালও করতেন, গাড়ি মেরামত করতেন, রাস্তা চিনতেন। একজন দক্ষ কোচোয়ান জানতেন কোন পথে ঘোড়া কম ক্লান্ত হবে, কোথায় পানি খাওয়াতে হবে, কোন সময় গাড়ি থামাতে হবে।
কোচোয়ানের পোশাকও ছিল বিশেষ রকমের। পাগড়ি বা টুপি, লম্বা কোট, হাতে চাবুক। অভিজাত পরিবারের কোচোয়ানরা বাহারি পোশাক পরতেন, মনিবের বাহানার সাথে মিলিয়ে।
পুরান ঢাকায় প্রায় ২০০ বছর ধরে বহাল রয়েছে স্থানীয়ভাবে টমটম নামে পরিচিত এই ঘোড়ার গাড়ি। চকবাজার, লালবাগ, নবাবপুর, ইসলামপুর, সদরঘাট এলাকায় এখনো কয়েকটি টমটম চলে, বেশিরভাগই মালামাল পরিবহনে, কিছুটা যাত্রীবাহী।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
টমটম নামটি কোথা থেকে এসেছে?
টমটম শব্দের উৎপত্তি নিয়ে কয়েকটি মত আছে। একটি মত হলো: ঘোড়ার খুরের “টম টম” শব্দ থেকেই এই নাম এসেছে। আরেকটি মত হলো: এটি ইংরেজি “Tom Tom” থেকে আসা, যার অর্থ একটি ছোট ঢোল। তৃতীয় মত অনুযায়ী: ব্রিটিশ আমলে ঢাকার পুরান এলাকার মানুষ এই নামে ডাকতে শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে এটি প্রচলিত হয়ে যায়। যাই হোক, “টমটম” এখন পুরান ঢাকার ঘোড়ার গাড়ির প্রায় সরকারি নাম হয়ে গেছে।
ঘোড়ার গাড়ি কি গরুর গাড়ির চেয়ে দ্রুত ছিল?
হ্যাঁ, অনেক বেশি দ্রুত। গরুর গাড়ির গতি ছিল ঘণ্টায় ৫-৮ কিলোমিটার। ঘোড়ার গাড়ি স্বাভাবিক গতিতে ১৫-২০ কিলোমিটার, এবং তেজি ঘোড়ায় ৩০-৪০ কিলোমিটারও ছাড়িয়ে যেত। এই গতির কারণেই ঘোড়ার গাড়ি শহরে বেশি উপযোগী ছিল এবং দ্রুত বার্তা বা জরুরি যাতায়াতে ব্যবহার হত।
গরুর গাড়ি ও ঘোড়ার গাড়ির মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
মূল পার্থক্য অনেকগুলো। ব্যবহারিকভাবে: গরুর গাড়ি ছিল গ্রামীণ মাঠে, ফসল বহনে, ঘোড়ার গাড়ি ছিল শহরে যাত্রী পরিবহনে। শ্রেণি বিভাজনে: গরুর গাড়ি কৃষকের যান, ঘোড়ার গাড়ি অভিজাতের। গতিতে: ঘোড়ার গাড়ি অনেক দ্রুত। খরচে: ঘোড়া পালনের খরচ বেশি, তাই ঘোড়ার গাড়ি সবসময় ধনীদের বাহন ছিল।
ফেসবুক: Kuhudak