আমার সোনার বাংলা, গানের সুরে যে দেশের ছবি ভাসে, সেই দেশের প্রতিটি নদীতে একদিন ভেসে বেড়াত হাজার রকমের নৌকা (Boat)। পঞ্চাশ ধরনের কাঠের নৌকা, লক্ষ মাঝির গান বাংলাদেশের নৌকা শুধু বাহন হিসেবেই নয়, ছিল জীবনের অংশ। বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে তাকালে মনে হয় নদীর জালে বোনা একটা পাটি। পানিময় এ দেশের জনজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ নৌপথ ও নৌযান। যেখানে রাস্তা নেই, যেখানে গাড়ি যায় না, যেখানে পা রাখলে কাদায় ডুবে যায়, সেখানে নৌকাই ছিল একমাত্র ভরসা। বন্যায় গ্রাম ভাসলে নৌকাই ভরসা, বিয়ের কনেকে নৌকায় নিয়ে যায়, মাছ ধরা থেকে মাল বহন সব।
একসময় বাংলাদেশে পঞ্চাশ ধরনেরও বেশি কাঠের নৌকা ছিল। প্রতিটি অঞ্চলে ভিন্ন নামের, ভিন্ন গঠনের, ভিন্ন কাজের নৌকা। মাঝির গান ছিল, ভাটিয়ালির সুর ছিল, নৌকার গলুইয়ে রঙিন নকশা ছিল। সেই সব এখন স্মৃতি হয়ে যাচ্ছে।
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
| বাংলা নাম | নৌকা, নাও, তরী |
| চালকের নাম | মাঝি, কান্ডারি, মাল্লা |
| ঐতিহ্যবাহী ধরন | প্রায় ৫০ ধরনের |
| উপাদান | জারুল, শাল, সুন্দরী, সেগুন কাঠ |
| প্রাচীনতম প্রমাণ | চন্দ্রকেতুগড়, খ্রি.পূ. ৩য় শতক |
| নৌকাবাইচ | বর্ষাকালীন জাতীয় উৎসব |
ইতিহাস
প্রাচীন বাংলার অন্যতম কেন্দ্র চন্দ্রকেতু গড়ে পাওয়া বেশ কিছু পোড়ামাটির সিলে নৌকার চিত্র আছে, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের। তারও আগে সিন্ধু সভ্যতার সময় থেকে এই অঞ্চলে নৌপরিবহনের প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রাচীন বাংলার বন্দর চট্টগ্রাম, সোনারগাঁও, তাম্রলিপ্তি থেকে দূর দেশে নৌবাণিজ্য চলত।
মোগল আমলে ঢাকা রাজধানী হওয়ার পর বুড়িগঙ্গা ছিল বাণিজ্যের মূল ধমনি। সওদাগরি নৌকায় কাপড়, মসলা, লবণ যেত। সুলতানি ও মোগল নৌবাহিনীতে বিশাল রণতরী থাকত। ব্রিটিশ আমলে স্টিমার এলেও ছোট নদী ও খালে দেশীয় নৌকাই ছিল একমাত্র বাহন।
নৌকার গঠন
নৌকা-নির্মাণে সচরাচর জারুল, শাল, সুন্দরী ও সেগুন কাঠ ব্যবহৃত হয়। কাঠের তক্তা বাঁকিয়ে নৌকার আকৃতি দেওয়া হত, যার জন্য বিশেষ দক্ষতা লাগত। নৌকা নির্মাতাদের মৌখিক বর্ণনার মাধ্যমে এর নির্মাণকৌশল বংশ পরম্পরায় টিকে আছে।
- গলুই
- হাল / কাণ্ডারি
- বৈঠা / দাঁড়
- পাল
- খোল / পেট
- ছৈ
- মাস্তুল
- নোঙর
নৌকার নাম:
- ডিঙি
- ডোঙা
- বজরা
- বাতনাই
- মলার
- বালার
- সাম্পান
- কোশা
- পাতাম
- সওদাগরি
- কুন্দা
- ভেলা
মাঝির জীবন ও ভাটিয়ালি গান
নৌকার শেকড়ে মাঝির কথা না বললে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মাঝি বা মাল্লা ছিলেন নদীর মানুষ। রাতে তারা দেখে পথ চিনতেন, স্রোতের কথা পড়তেন, বানের সময় সামাল দিতেন। বাংলাদেশের ভাটিয়ালি গান মাঝিদের জীবন থেকেই জন্ম নিয়েছে। নদীর বুকে একা নৌকা চালাতে চালাতে মাঝি যে গান গাইতেন, সেই সুর হয়ে উঠেছে বাংলার আত্মার গান।
১৯৯০-এর দশক থেকে বাংলাদেশে নৌকায় মোটর লাগানো শুরু হয়। এর ফলে নৌকা একটি যান্ত্রিক নৌযানে পরিণত হয়। এ যান্ত্রিক নৌকাগুলো শ্যালো নৌকা নামে পরিচিতি লাভ করে; কেননা পানি সেচের জন্য ব্যবহৃত শ্যালো পাম্পের মোটর সংযুক্ত করে স্থানীয় প্রযুক্তি দিয়ে এসব নৌকা চালানোর ব্যবস্থা করা হয়।
বড় বাণিজ্যিক নৌকাগুলো আরও আগেই বিলুপ্ত হয়েছে। বাতনাই নৌকায় ১৪০ থেকে ১৬০ টন মাল বহন করা যেত। কিন্তু যান্ত্রিক নৌকার কম খরচ ও কম সময়ের কারণে এ ধরনের বড় পালের নৌকা এখন কোথাও দেখা যায় না। তবে ছোট কাঠের নৌকা এখনো টিকে আছে হাওর অঞ্চলে, বিলে, খালে।
Facebook: Kuhudak